ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ, তবুও কেন বাড়ছে খরচ?
চাকরি থাকবে তো? ভবিষ্যতে নিজের বাড়ি কেনা সম্ভব হবে? জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে সঞ্চয় করে আদৌ লাভ কী? এই অনিশ্চয়তার মধ্যে কেউ কেউ খরচ কমানোর বদলে উল্টো বেশি খরচ করতে শুরু করেন। দুশ্চিন্তা ভুলতে পছন্দের পোশাক, দামি গ্যাজেট কিংবা ভ্রমণের টিকিট কেনেন। মনোবিজ্ঞানে এ প্রবণতাকে ‘ডুম স্পেন্ডিং’ বলা হয়।
ভোক্তা-আচরণ গবেষক জেসমিন মোহসেন সম্প্রতি তার এক লেখায় ব্যাখ্যা করেছেন, যখন ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত মনে হয়, তখন মানুষ বর্তমানের আনন্দকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করেন। এর পেছনে নিয়ন্ত্রণহীন কেনাকাটার প্রবণতা, হতাশা ও মানসিক স্বস্তির প্রয়োজন কাজ করতে পারে।
সাধারণত মানুষ ভবিষ্যতের কথা ভেবে সঞ্চয় করেন। নিজের বাড়ি কেনা, অবসরজীবন কিংবা আর্থিক নিরাপত্তার জন্য বর্তমানের কিছু ইচ্ছা পূরণ স্থগিত রাখেন। কিন্তু ভবিষ্যতে সেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে সঞ্চয়ের জন্য ত্যাগ স্বীকারের আগ্রহ কমে যেতে পারে।
মনে হতে পারে, ভবিষ্যতে বাড়ি কেনাই যদি সম্ভব না হয়, তাহলে এখন কিছু টাকা খরচ করে আনন্দ পেতে ক্ষতি কী? এভাবে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের বদলে নিশ্চিত বর্তমানের আনন্দ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা মানুষকে অসহায় বোধ করাতে পারে। মূল্যস্ফীতি, বাড়িভাড়া কিংবা চাকরির নিরাপত্তার মতো বিষয় ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে থাকে না। কিন্তু কেনাকাটার সময় পছন্দ করা, সিদ্ধান্ত নেওয়া ও অর্ডার দেওয়ার মাধ্যমে সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণের অনুভূতি ফিরে পাওয়া যায়।
কখনও কেনাকাটা নিজের সম্পর্কে ভালো বোধ করার উপায়ও হয়ে ওঠে। কেউ নতুন পোশাক কিনে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে চান, কেউ ভ্রমণের পরিকল্পনায় জীবনে নতুনত্ব খোঁজেন, আবার কেউ দামি পণ্যকে সাফল্যের প্রতীক হিসেবে দেখেন। অর্থাৎ পণ্যের পাশাপাশি মানুষ কখনও স্বস্তি, পরিচিতি কিংবা নিজের পছন্দের মানুষ হয়ে ওঠার অনুভূতিও কিনতে চান।
কিন্তু এই স্বস্তি সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কেনাকাটার পর আবার আর্থিক দুশ্চিন্তা ফিরে আসতে পারে। অতিরিক্ত খরচের কারণে ঋণ বা অর্থসংকট তৈরি হলে উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়। এভাবে দুশ্চিন্তা থেকে খরচ, খরচ থেকে নতুন দুশ্চিন্তার চক্র তৈরি হতে পারে।
ডুম স্পেন্ডিং কমাতে শুধু নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার উপদেশ যথেষ্ট নয়। কেনাকাটার পেছনে কোন অনুভূতি কাজ করছে, সেটিও বোঝা জরুরি। দুশ্চিন্তা বা মন খারাপের সময় বারবার কেনাকাটা করতে ইচ্ছা হলে একটু থামুন। নিজেকে প্রশ্ন করুন, পণ্যটি সত্যিই প্রয়োজন, নাকি আপাতত ভালো বোধ করার জন্য কিনতে চাইছেন?
বড় কোনও কেনাকাটার আগে কিছুটা সময় অপেক্ষা করা, মাসিক খরচের সীমা নির্ধারণ করা এবং ভবিষ্যতের লক্ষ্য অনুযায়ী সঞ্চয়ের পরিকল্পনা করাও সহায়ক হতে পারে। অনলাইন কেনাকাটার বিজ্ঞাপন ও তাৎক্ষণিক ছাড়ের প্রলোভন থেকে দূরে থাকলেও অপ্রয়োজনীয় খরচ কমতে পারে।
ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের সময়ে সাময়িক আনন্দ খোঁজা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেই আনন্দ যদি আর্থিক নিরাপত্তাকেই আরও দুর্বল করে, তাহলে তা শেষ পর্যন্ত দুশ্চিন্তা কমানোর বদলে বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই সমস্যাটি শুধু বেশি খরচ করার নয়; কখনও কখনও এর গভীরে থাকে ভবিষ্যতের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলা।