চুয়াডাঙ্গার কার্পাসডাঙ্গায় নজরুলের আটচালা ঘর এখনও দাঁড়িয়ে

চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার কার্পাসডাঙ্গার মিশনপাড়ায় অবস্থিত একটি সাধারণ আটচালা ঘর, যা মাটির দেওয়াল ও ছনের ছাউনি নিয়ে গঠিত। বাহ্যিকভাবে এটি আর পাঁচটা গ্রামের পুরনো বাড়ির মতো মনে হলেও, এই ঘরের সঙ্গে জড়িত রয়েছে বাংলা সাহিত্যের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতি। এই বাড়ি আজও অতীতের গল্প শোনায়, যেখানে ইতিহাস, সাহিত্য ও গ্রামবাংলার ঐতিহ্য একত্রিত হয়েছে।

কার্পাসডাঙ্গার এই আটচালা ঘরটি শিক্ষক ও রাজনীতিক হর্ষপ্রিয় বিশ্বাসের বাড়ির অংশ ছিল। তিনি অবিভক্ত বাংলার নদিয়া অঞ্চলের কংগ্রেস রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং তাঁর বাড়ি রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল।

কলকাতায় থাকাকালীন মহিম সরকারের সঙ্গে কবি নজরুলের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। তাঁর আমন্ত্রণে ১৯২০-এর দশকে কবি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কার্পাসডাঙ্গায় আসেন। এখানে হর্ষপ্রিয় বিশ্বাসের আটচালা ঘরে থাকার ব্যবস্থা হয়। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে যে, নজরুল এক দফায় প্রায় দুই মাস এই বাড়িতে কাটিয়েছিলেন।

স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে যে, কার্পাসডাঙ্গায় থাকার সময় কবি এই অঞ্চলের পরিবেশ ও মানুষের জীবনযাত্রা থেকে লেখার উপাদান খুঁজে পেয়েছিলেন। তাঁর বিখ্যাত ছড়া ‘লিচুচোর’-এর স্মৃতিও এই এলাকার সঙ্গে জড়িত বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাড়িটির সঙ্গে ব্রিটিশবিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও যোগ ছিল। স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা ও বৈঠকের জন্য বাড়িটি ব্যবহৃত হতো, ফলে আটচালা ঘরটি বাংলা সাহিত্য এবং তৎকালীন রাজনৈতিক ইতিহাস দুই ক্ষেত্রেই তাৎপর্যপূর্ণ।

নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত এই আটচালা ঘরটি দর্শনার্থীদের জন্য অন্যতম আকর্ষণ। এখানে কবির ব্যবহৃত খাট ও আলমারি সংরক্ষিত রয়েছে। সাধারণ গ্রামীণ পরিবেশে দাঁড়িয়ে থাকা এই ঘর দর্শনার্থীদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় প্রায় এক শতাব্দী আগের সময়ে।

নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত আটচালা ঘরটি চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা উপজেলার কার্পাসডাঙ্গা ইউনিয়নের মিশনপাড়ায় অবস্থিত। দর্শনা–মুজিবনগর সড়কের কাছেই রয়েছে ঐতিহাসিক এই বাড়িটি। চুয়াডাঙ্গা শহর থেকে সড়কপথে কার্পাসডাঙ্গায় পৌঁছে স্থানীয়দের সাহায্যে মিশনপাড়ার এই ঠিকানায় যাওয়া যায়।

সময় পরিবর্তনের সঙ্গে বহু পুরনো স্থাপনা হারিয়ে গেলেও কার্পাসডাঙ্গার এই আটচালা ঘরটি এখনও টিকে রয়েছে মূলত হর্ষপ্রিয় বিশ্বাসের উত্তরসূরিদের উদ্যোগে। তবে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলিতে বাড়িটির সংরক্ষণ নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। ঘরটির নিয়মিত মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আরও উদ্যোগ প্রয়োজন বলে স্থানীয় পর্যায়ে দাবি রয়েছে।

কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের বিদ্রোহী কবি এবং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কবির স্মৃতি, সাহিত্যচর্চা এবং একটি সময়ের রাজনৈতিক-সামাজিক ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে এই বাড়িটি সংরক্ষণ করা গেলে আগামী প্রজন্মও কাছ থেকে ইতিহাস জানার সুযোগ পাবে।

All Categories