সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন: অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ
নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির বেশিরভাগই পূরণ করেছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার, এমন দাবি করেছে সরকার। কিছু প্রতিশ্রুতি ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে, কিছু বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। তবে রাষ্ট্রীয় নিয়োগে স্বচ্ছতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন, জাতীয় সরকার গঠন, দ্রব্যমূল্য, ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা, স্থানীয় সরকার, ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ বণ্টনসহ বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সরকারি দল বিএনপি বলছে, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এখনও আট মাস পূর্ণ হয়নি এবং সব প্রতিশ্রুতি একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।
২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ লন্ডন থেকে দেশে ফেরেন তারেক রহমান। হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। পূর্বাচলে প্রথম জনসভায় তিনি বলেন, ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান।’ সেখানে প্রতিহিংসার বদলে সহনশীলতা এবং দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দেন। নির্বাচনি ইশতেহার ও জেলা পর্যায়ের সমাবেশগুলোতেও এসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এরই মধ্যে নারীপ্রধান পরিবারের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকদের জন্য ফার্মার কার্ড, ইমাম-মুয়াজ্জিন ও পুরোহিতদের সম্মানী, সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ, খাল খনন, বৃক্ষরোপণ, সরকারি বেতন স্কেল এবং খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘন না করা, স্নাতক পর্যন্ত মেয়েদের বিনামূল্যে শিক্ষা, বিটিভিতে বিরোধী দলের সংবাদ প্রচার ও তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের রায় হওয়ার বিষয়টিকেও প্রতিশ্রুতি পূরণের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
তবে রাষ্ট্রীয় নিয়োগে স্বচ্ছতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন, জাতীয় সরকার গঠন, দ্রব্যমূল্য, ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা, নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের বদলে প্রশাসক নিয়োগ, ডেপুটি স্পিকার এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ বণ্টন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক বলেন, সরকারের সদিচ্ছা রয়েছে। তবে আর্থিক সীমাবদ্ধতা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চ্যালেঞ্জ, আইনশৃঙ্খলা ও বাজার পরিস্থিতি এখনও অসহনীয়। রেমিট্যান্স ভালো থাকলেও মেগা প্রকল্পগুলো নিয়ে নতুন করে ভাবা দরকার। জাতীয় সরকার ও রেইনবো নেশন গঠনের প্রতিশ্রুতি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তার মতে, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে উন্নতি হলেও রাজনৈতিক সূচকে পিছিয়ে রয়েছে সরকার।
বিএনপির প্রতিশ্রুতিতে মেধা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নিয়োগ এবং প্রশাসন ও বিচার বিভাগকে রাজনীতিমুক্ত করার কথা বলা হয়েছিল। তবে বিরোধীদের অভিযোগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব পদে দলীয় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
তারেক রহমান বলেছিলেন, তিনি জোটের শরিকদের নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন করবেন। প্রথম দফায় জোনায়েদ সাকি, নুরুল নুর ও ববি হাজ্জাজকে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২১ আগস্ট আন্দালীব রহমান পার্থকে মন্ত্রী করা হয়। তবে অন্য জোটসঙ্গীদের সরকারে জায়গা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। উবায়দুল্লাহ ফারুকসহ অন্যরা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। সরকার তাদের ধৈর্য ধরতে বলেছে।
দ্রব্যমূল্য সহনীয় রাখার প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু শিশু খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে। প্যাকেটজাত পণ্যের দামও বেড়েছে। সরকার এর জন্য বৈশ্বিক পরিস্থিতিকে দায়ী করছে। বাণিজ্যমন্ত্রী বিশেষ টাস্কফোর্সের কথা বলেছেন।
শিল্প ও গ্রামে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রতিশ্রুতি ছিল। বিরোধীদের অভিযোগ, এ ক্ষেত্রে তেমন উন্নতি হয়নি। প্রধানমন্ত্রী সংসদে এ নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করেছেন, শিগগিরই পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার পরিচালনার প্রতিশ্রুতি থাকলেও ১২টি সিটি করপোরেশন ও সব জেলা পরিষদে দলীয় প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিরোধীরা এটিকে দলীয়করণ হিসেবে দেখছে। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত দেশগুলোতেও দলীয়ভাবে নিয়োগ দেওয়ার নজির রয়েছে।
বিএনপি বলেছিল, ডেপুটি স্পিকারের পদ বিরোধী দলকে দেওয়া হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদও শুরুতে এমন কথা বলেছিলেন। বিরোধী দল এতে রাজি হয়নি। বিরোধীদের বক্তব্য, সংবিধান সংস্কার না হওয়ায় তারা এতে সম্মত হয়নি। পরে সরকার জানায়, প্রস্তাবটি মৌখিক ছিল, লিখিত নয়।
সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদেও বিরোধী দলকে আনুপাতিক হারে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। সরকার শুরুতে কয়েকটি পদ দেওয়ার প্রস্তাব করেছিল। পরে সংবিধান সংস্কারবিষয়ক কমিটিতে বিরোধী দল সদস্যদের নাম না দেওয়ায় সেই প্রস্তাব প্রত্যাহার করা হয়। সরকার বলছে, এ নিয়ে আলোচনার সুযোগ এখনও রয়েছে।
জামায়াত বলছে, বিএনপির প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি। সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে শৃঙ্খলা না ফেরার বিষয়গুলো সরকারের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। স্থানীয় সরকারে প্রশাসক নিয়োগকেও তিনি দলীয় শ্রেষ্ঠত্বের উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
গত বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সরকারের উপদেষ্টা মাহদি আমিন বলেন, অধিকাংশ প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়েছে। বাকিগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, সরকার দ্রুততার সঙ্গে অধিকাংশ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেছে। ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার কার্ড ও খাল খননের মতো কর্মসূচি এর মধ্যে রয়েছে। তার দাবি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভালো এবং সাত মাসে রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়নি। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারও সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তার ভাষ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা শতাধিক অধ্যাদেশ প্রথম সংসদ অধিবেশনেই আইনে পরিণত করা হয়েছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াও বন্ধ হয়নি। অবকাঠামো উন্নয়ন হচ্ছে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে স্থিতিশীলতা রয়েছে। তবে সব প্রতিশ্রুতি শতভাগ বাস্তবায়নে আরও সময় প্রয়োজন।