শান্তির সন্ধানে বিশ্ব, শুরু হোক নিজ থেকে
‘শান্তি’ একটি ক্ষুদ্র শব্দ হলেও এর অর্থ মানুষের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। শান্তি মানে শুধুমাত্র যুদ্ধের অভাব নয়; বরং পরিবারে স্বস্তি, বন্ধুত্বে বিশ্বাস, প্রতিবেশীর সঙ্গে সৌহার্দ্য, কর্মক্ষেত্রে পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং নিজের ভেতরের প্রশান্তিও শান্তির অংশ। এই বৃহত্তর অর্থকে সামনে রেখে প্রতি বছর পালিত হয় আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস।
১৯৮২ সালে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দফতরে শান্তির ঘণ্টা বাজানোর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস পালনের একটি ঐতিহ্য শুরু হয়। দিনটি বিশ্বজুড়ে শান্তির মূল্য ও গুরুত্ব স্মরণ করার পাশাপাশি শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নেওয়ার একটি বিশেষ উপলক্ষ।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ, সংঘাত ও সহিংসতা শান্তির বড় বাধা। তবে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ছোট ছোট দ্বন্দ্বও ব্যক্তিগত শান্তিকে নষ্ট করতে পারে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মতবিরোধ, সহকর্মীর সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি কিংবা প্রতিবেশীর সঙ্গে বিরোধ এসবও অশান্তি সৃষ্টি করে।
শান্তির শুরু হতে পারে কাছের মানুষদের সঙ্গে। দীর্ঘদিনের অভিমান মিটিয়ে কথা বলা, ভুল হলে ক্ষমা চাওয়া, অন্যের মতামত মন দিয়ে শোনা কিংবা নিজের ভুলের জন্য নিজেকেও ক্ষমা করা এসব উদ্যোগই শান্তির চর্চা।
একটি মোমবাতি জ্বালিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে বসা, নিজের কাজ ও আচরণ নিয়ে ভাবা, পুরোনো ক্ষোভ ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করা কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোও হতে পারে এই দিনের অর্থবহ উদযাপন।
আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস প্রতিষ্ঠার পেছনে জাতিসংঘের উদ্যোগ রয়েছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ সর্বসম্মতভাবে একটি প্রস্তাব গ্রহণের মাধ্যমে দিবসটি প্রতিষ্ঠা করে, যার উদ্দেশ্য ছিল সব দেশ ও জনগণের মধ্যে শান্তির আদর্শকে স্মরণ ও শক্তিশালী করা।
১৯৮২ সাল থেকে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দফতরে শান্তির ঘণ্টা বাজানোর মাধ্যমে দিবসটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমের একটি ঐতিহ্য গড়ে ওঠে। ২০১১ সালে ২১ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। দিনটি সহিংসতা বন্ধ এবং যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানোর পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে শান্তির আদর্শকে এগিয়ে নেওয়ার উপলক্ষ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসের সঙ্গে প্রতিবছর একটি নির্দিষ্ট প্রতিপাদ্য যুক্ত থাকে। এসব প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে শান্তি, সহমর্মিতা, বৈষম্যহীনতা, পরিবেশ রক্ষা এবং সংঘাত নিরসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে।
বিগত বছরগুলোর প্রতিপাদ্যের মধ্যে ছিল, ‘বর্ণবাদ বন্ধ করুন, শান্তি গড়ে তুলুন’, ‘ন্যায়সংগত ও টেকসই বিশ্বের জন্য আরও ভালোভাবে ঘুরে দাঁড়ানো’, ‘একসঙ্গে শান্তির রূপ দিই’ এবং ‘শান্তির জন্য জলবায়ু কার্যক্রম’।
প্রতিপাদ্য প্রতিবছর পরিবর্তিত হলেও শান্তির একটি সর্বজনীন বার্তা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, ‘পৃথিবীতে শান্তি বিরাজ করুক।’ এই বার্তা বয়স, সংস্কৃতি, ধর্ম কিংবা সামাজিক পরিচয়ের পার্থক্য ভুলে মানুষকে একটি অভিন্ন আকাঙ্ক্ষার জায়গায় একত্রিত করে। সেই আকাঙ্ক্ষা হলো শান্তিপূর্ণ পৃথিবী।
আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসের অন্যতম প্রতীকী আয়োজন হলো বিশ্বব্যাপী এক মিনিট নীরবতা পালন। প্রতিটি সময় অঞ্চলে স্থানীয় সময় দুপুর ১২টায় যে যেখানে অবস্থান করছেন, সেখান থেকেই এক মিনিট নীরব থেকে শান্তির প্রতি সমর্থন জানাতে পারেন।
যুদ্ধ, সহিংসতা ও সংঘাতের বিপরীতে শান্তির গুরুত্ব স্মরণ করার এই আয়োজন অত্যন্ত সরল হলেও এর তাৎপর্য গভীর। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে প্রতি ঘণ্টার শুরুতে যখন কেউ নীরবতায় অংশ নেন, তখন তা শান্তির বার্তা পৌঁছে দেয়।
এক মিনিটের নীরবতা মনে করিয়ে দেয়, শান্তির জন্য বড় কোনও আয়োজনের প্রয়োজন নেই। কখনও নীরবতাই সবচেয়ে শক্তিশালী বার্তা হতে পারে।
শান্তি প্রতিষ্ঠার আরেকটি উদ্যোগ হতে পারে বিভিন্ন পটভূমি, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের মানুষকে একসঙ্গে বসিয়ে খাবারের আয়োজন করা। একই টেবিলে বসে খাবার ভাগ করে নেওয়ার পাশাপাশি পারস্পরিক বোঝাপড়া, সহাবস্থান, শ্রদ্ধা ও মিলের জায়গাগুলো নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।
একসঙ্গে খাবার খাওয়ার আয়োজন অনেক সময় মানুষের দূরত্ব কমিয়ে দিতে পারে। অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, তার মতামত বোঝার চেষ্টা করা এবং সহমর্মিতা দেখানোর মধ্যে দিয়ে তৈরি হতে পারে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বন্ধনের পরিবেশ।
শান্তির চর্চার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হতে পারে পরিবার। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই ভাগাভাগি করা, একে অপরকে সহযোগিতা করা এবং মতবিরোধ হলে রাগ বা আক্রমণাত্মক আচরণের পরিবর্তে কথা বলে সমস্যার সমাধান করতে শেখানো যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস উপলক্ষে শিশুদের নিয়ে শান্তি, সহমর্মিতা ও সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা, ছবি আঁকা, কবিতা লেখা কিংবা সাংস্কৃতিক আয়োজন করা যেতে পারে।
তবে শান্তির শিক্ষা শুধু শিশুদের জন্য নয়। বড়দের আচরণও শিশুদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। তাই পরিবারে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা, ধৈর্য ও সহনশীলতার চর্চা করাও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ তৈরির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস মূলত একটি দিনের উদযাপন হলেও শান্তির প্রয়োজন প্রতিদিন। বাড়িতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কর্মক্ষেত্রে, প্রতিবেশী সমাজে কিংবা বৃহত্তর বিশ্বে সব জায়গাতেই শান্তির চর্চা প্রয়োজন।
শান্তি প্রতিষ্ঠা কোনও একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়। অন্যের কথা শোনা, মতের পার্থক্যকে সম্মান করা, ক্ষোভের পরিবর্তে আলোচনার পথ বেছে নেওয়া, ভুল হলে ক্ষমা চাওয়া এবং অন্যের প্রতি সহমর্মী হওয়া এসব ছোট ছোট আচরণ থেকেই বড় পরিবর্তনের শুরু হতে পারে।
তাহলে আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসের সবচেয়ে বড় বার্তা হলো শান্তি শুধুমাত্র উদযাপনের বিষয় নয়, শান্তি একটি চর্চা। আর সেই চর্চা শুরু হতে পারে নিজের ঘর থেকেই, নিজের আচরণ থেকে, আজ থেকেই।