বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সরকারি দায়িত্ব, মাঠের শূন্যতা পূরণ হবে কীভাবে?

সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া আলোচিত ঘটনাবলীর কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এসব ঘটনার বেশিরভাগই রাজনৈতিক নয়, বরং ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব থেকে উদ্ভূত। তবে কিছু ঘটনায় ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা দলটি অস্বীকার করেনি। শীর্ষ নেতারা জানিয়েছেন, দলের নাম ভাঙিয়ে কেউ অপকর্ম করলে তার দায় নেবে না বিএনপি। এ ঘোষণার পর কিছু নেতার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

মিরপুরে স্বল্প আয়ের মানুষের কল্যাণে পরিচালিত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে ভাঙচুর, ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুর, গুলিস্তানে জাসদের কার্যালয় ঘেরাওসহ বেশ কয়েকটি ঘটনায় সরকার ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে। এর মধ্যে ৩০ সেপ্টেম্বর মিরপুরের ১০ নম্বর গোলচত্বরে হকারদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

রাড্ডা সেন্টারে হামলার ঘটনায় সাংগঠনিক তদন্তে এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে, দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) তিনি সংসদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। ইতোমধ্যে তার আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে।

এর আগে বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি, যুবদল এবং পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এদিকে, আদাবরে বাড়ির মালিককে চাঁদাবাজদের হুমকি এবং আওয়ামী লীগের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

এসব ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে, বারবার কেন এমন ঘটনা ঘটছে? এটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতা, নাকি বিএনপির সাংগঠনিক উদাসীনতা? বিশেষ করে শীর্ষ নেতাদের সরকারের উচ্চপর্যায়ে যোগ দেওয়ার কারণে দলে সাংগঠনিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে কিনা, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক যুগ্ম মহাসচিব জানান, বর্তমানে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ আছে, এমন নেতা দলে হাতে গোনা। বিগত দেড় দশকে মাঠপর্যায়ে পোড় খাওয়া নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় এ ক্ষেত্রে কিছুটা ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

বর্তমান ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও কর্মীবান্ধব হলেও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টার পদ সামলানোর কারণে দলকে সময় দিতে পারছেন না। এভাবে অনেক নেতাই সরকারের দায়িত্বে রয়েছেন।

এতে তৃণমূলের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সংগঠনের সমন্বয়ে ঘাটতি হওয়া স্বাভাবিক। ওই নেতা মনে করেন, প্রশাসনের ওপর নির্ভর করে কতদিন চলবে দলটি? সাংগঠনিক নেতারাই মাঠপর্যায়ের মেজাজ বুঝতে পারেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, জুলাই আন্দোলনের একটি আদর্শিক বার্তা ছিল। দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি থেকে মানুষ মুক্তি চেয়েছিল। বিএনপি এখনও বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারেনি, তাই বিভিন্ন স্থানে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে।

তিনি বলেন, ক্ষমতাসীন দলের বিএনপিতে মাঠ থেকে উঠে আসা নেতৃত্বের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। হকার সমস্যায় পুলিশ কী করবে? রাজনৈতিক নেতারা সেখানে গেলে সহজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির এক যুগ্ম আহ্বায়ক বলেন, বিএনপির প্রাণভোমরা হচ্ছেন তৃণমূলের নেতারা। আন্দোলনে তারা ফ্যাসিবাদী সরকারের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে মাঠে সংগ্রাম করেছেন। শীর্ষ নেতাদের প্রেরণার অভাব অনুভূত হচ্ছে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হওয়ার কারণে সাংগঠনিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও মন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা।

বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা মনে করেন, মাঠপর্যায় থেকে উঠে আসা আরও নেতৃত্ব তৈরি হওয়া জরুরি। জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহম্মাদ বলেন, বিএনপি রাজপথে লড়াই করা একটি দল। তৃণমূল নেতাদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

নিলোফার চৌধুরী মনি বলেন, বড় দল চালাতে মাঠপর্যায় থেকে উঠে আসা নেতাদের গুরুত্ব রয়েছে। তবে বিএনপিতে সব ধরনের নেতৃত্বের সমন্বয় ঘটেছে।

দলটির হাইকমান্ডও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞ নেতৃত্বের অভাব অনুভব করছে। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, বিএনপিতে নেতৃত্বের সংকট নেই। সাময়িক শূন্যতা দেখা দিতে পারে, তবে তা পূরণ হয়ে যাবে।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী দলের কাউন্সিল থেকে আরও অভিজ্ঞ নেতৃত্ব বের হয়ে আসবে। বিএনপি অতীতে প্রশাসনের ওপর নির্ভর করে চলেনি, ভবিষ্যতেও চলবে না।

All Categories