উখিয়ার রিসোর্ট-অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যু: জামিনযোগ্য ধারা দেওয়ায় ওসিকে তলব আদালতের
কক্সবাজারের উখিয়ায় পাটুয়ারটেক সৈকতের টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের প্রাণহানির মামলায় জামিনযোগ্য ধারা রাখায় উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমানকে আদালতে হাজির হতে বলা হয়েছে। ২৩ আসামির বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় জামিন অযোগ্য ধারা না থাকাকে আদালত গুরুতর অপরাধ হিসেবে দেখছেন।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) কক্সবাজারের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আসাদ উদ্দিন আসিফ এক আদেশে আগামী ২৯ অক্টোবর ওসিকে সশরীর উপস্থিত হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলেন। দণ্ডবিধির ২১৮ ধারায় তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, তা জানতে চেয়েছেন আদালত।
আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা শাহাজাহান এলাহী নূরী আদেশের কথা নিশ্চিত করে জানান, নির্দেশনার অনুলিপি ওসি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে পাঠানো হয়েছে।
ওসি আতিকুর রহমান বলেন, সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি আদালতের নোটিশ পাননি; পেলে যথাসময়ে হাজির হয়ে বক্তব্য দেবেন। ১০ জনের মৃত্যুতে তিনি মর্মাহত বলেও জানান। তাঁর দাবি, ঘটনার দিনের ব্যস্ততায় এজাহারে ৩০৪ ধারা বাদ পড়েছিল এবং পরদিন তা যুক্ত করতে আবেদন করা হয়।
আদেশে বলা হয়, ১৭ অক্টোবরের ওই অগ্নিকাণ্ডের মামলায় শুরুতে দণ্ডবিধির ৩০৪-ক, ৩৩৮ ও ৩৪ ধারা রাখা হয়েছিল। ১৯ অক্টোবর তদন্ত কর্মকর্তা ৩০৪ ধারা যোগ করার আবেদন করেন।
আদালতের পর্যবেক্ষণ, এজাহার নেওয়ার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা হিসেবে ওসি ইচ্ছা করেই ৩০৪ ধারা যুক্ত করেননি। ১০ জনের মৃত্যুর মতো ঘটনায় জামিন অযোগ্য ধারা বাদ দিয়ে জামিনযোগ্য ৩০৪-ক ধারায় মামলা নেওয়াকে আদালত গুরুতর অপরাধ বলেছেন। আসামিদের শাস্তি এড়াতে সহায়তার অসৎ উদ্দেশ্য ছিল কি না, সে প্রশ্নও আদেশে তোলা হয়েছে।
৩০৪ ধারায় দোষ প্রমাণিত হলে যাবজ্জীবন অথবা সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে; ৩০৪-ক ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ বছরের কারাদণ্ড।
আদেশে রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বলা হয়েছে, সেখানে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও জরুরি বহির্গমনের পথ ছিল না; আগুন লাগলে পর্যটকেরা ভেতরে আটকা পড়ে বের হতে পারেননি। দীর্ঘদিন এ ধরনের নিরাপত্তা ছাড়াই রিসোর্টটি চালানো হচ্ছিল বলেও আদালত পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন।
পুলিশ ও আদালত সূত্র জানায়, ১৭ অক্টোবর সকাল সাড়ে আটটার দিকে ৯৯৯ নম্বরে ফোন পেয়ে পুলিশ আগুনের খবর জানতে পারে। সোয়া নয়টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে তারা ফায়ার সার্ভিসকে আগুন নেভাতে দেখে। বেলা আড়াইটার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে এলে ১০টি মরদেহ উদ্ধার হয়। দগ্ধ হওয়ায় সে সময় কারও পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। ময়নাতদন্ত ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের জন্য লাশ কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
ওই রাত ১১টার দিকে উখিয়া থানার উপপরিদর্শক আশীষ সূত্রধর অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে মামলা করেন। এতে চারজনের নাম এবং রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁর অজ্ঞাতপরিচয় ১৯ কর্মীকে আসামি করা হয়, মোট আসামি ২৩ জন। নামধারী আসামিরা হলেন রিসোর্টের মালিক তানভীর সুলতান মিয়া (৩৮), প্রধান ব্যবস্থাপক সাঈদ আহমদ (৩২), ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সাইদ (৩০) ও সহকারী ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন সুমন (২৯)।
সহকারী ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেনকে ১৮ অক্টোবর বিকেলে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়। তাঁর সাত দিনের রিমান্ডের আবেদনের শুনানি সোমবার বিকাল পর্যন্ত হয়নি; মঙ্গলবার হতে পারে। তিনি এখন কক্সবাজার জেলা কারাগারে।
এদিকে ঘটনার নয় দিন পরও মালিক তানভীর সুলতান মিয়াসহ তিন আসামি ধরা পড়েননি। রিসোর্টের আরেক মালিক নেওয়াজ মোরশেদের নাম প্রাথমিক এজাহারে ছিল না; তাঁকে যুক্ত করতে আদালতে আবেদন করা হয়েছে বলে জানান ওসি।