খুলনায় ৯ মাসে ৭৩ খুন: জামিনে বেরিয়ে ফের হত্যায় জড়াচ্ছে আসামিরা, ছেলের পর বাবাও খুন

খুলনায় একের পর এক হত্যাকাণ্ড, গুলি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অস্ত্রধারী ও বিভিন্ন হত্যা মামলার আসামিরা গ্রেফতার হয়ে অল্প সময়ের মধ্যে জামিনে বেরিয়ে আসছেন। এসব আসামি উচ্চ আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে অপরাধ ও হত্যাকাণ্ডে জড়াচ্ছেন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত খুলনায় ৭৩ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যা জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। নগরীর বাসিন্দাদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, এরপর কে? কারণ একদিন কিংবা দুদিন পরই ঘটছে হত্যাকাণ্ড।

সর্বশেষ রূপসা উপজেলার আইচগাতি ইউনিয়নের দুর্জনীমহল গ্রামে আক্তার ঢালীকে গুলি করে হত্যার পর তার স্ত্রী নাসিমা বেগম আতঙ্কের কথা জানালেন। তিনি বলেন, ছেলে হত্যার আসামিরা জামিনে এসে বাবাকে হত্যা করেছে, জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে থানায় জিডি করা হয়েছিল। কিন্তু পুলিশ তাকে বাঁচাতে পারেনি। ফলে তিনি আর মামলা করতে চান না। এমনকি কিছু ঘটার ভয়ে মুখ খোলারও সাহস করছেন না।

পুলিশও বলছে, আসামিরা জামিনে বেরিয়ে ফের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তারা আরও ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করছে। প্রত্যেক ঘটনার পর দুই-চার জন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়, কিন্তু তারা দ্রুত জামিনে বেরিয়ে যায়।

এমন পরিস্থিতিতে খুলনায় বারবার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সচেতন নাগরিক ও সাধারণ মানুষ। সম্প্রতি কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা নিয়ে সমালোচনা হলেও অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে। নগরবাসীর প্রশ্ন, একই ধরনের অপরাধে জড়িতদের গ্রেফতার করা হলেও তারা কীভাবে দ্রুত জামিনে বেরিয়ে যাচ্ছে।

অপরাধীদের গ্রেফতার ও জামিনে বেরিয়ে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার এই দুইয়ের মধ্যে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে নগরীর নিরাপত্তা নিয়ে মানুষের উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত খুলনা মহানগরীতে ৩৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এসব ঘটনায় ২৩টি হত্যা মামলা হয়েছে। কারণ একাধিক হত্যার ঘটনায় একটি মামলা হওয়ায় মোট মামলার সংখ্যা ২৩টি। এসব মামলার মধ্যে পুলিশের হিসাবে ১৯টির রহস্য উদ্ঘাটন হয়েছে, গ্রেফতার হয়েছেন ৮১ জন। বাকিগুলোর তদন্ত চলছে।

পুলিশ বলছে, রহস্য উদঘাটন হওয়া ১৯টি মামলার ১৭টি তদন্তাধীন এবং দুটি বিচারাধীন। এগুলোর ১৪টিতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। তদন্তে দেখা যায়, নয়টি হত্যায় পারিবারিক ও ব্যক্তিগত বিরোধ, সাতটিতে মাদক ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্ব, দুটিতে ইজিবাইক চুরি এবং একটি চোর সন্দেহে পিটুনির ঘটনা।

খুলনা জেলা পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত খুলনা জেলার নয়টি থানা এলাকায় ৩৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৩৫টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ২৫টির রহস্য উদ্ঘাটন হয়েছে। এর মধ্যে নয়টি হত্যা ঘটেছে গুলিতে। পারিবারিক বিরোধে চারটি, শ্বাসরোধে দুটি, রাজনৈতিক কারণে দুটি, সামাজিক বিরোধে ১৩টি, কুপিয়ে তিনটি আর দুটি অজ্ঞাত কারণে। এর মধ্যে গুলিতে নয়টি ও কুপিয়ে তিনটি ঘটনার পেছনে রয়েছে মাদক, চুরি-ছিনতাই ও আধিপত্য বিস্তার।

হত্যা মামলার আসামিরা জামিনে বেরিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে। খুলনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। রূপসায় ছেলেকে হত্যার দেড় মাসের মাথায় বাবাকে হত্যার ঘটনাটি চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। ছেলে হত্যা মামলার আসামিরা উচ্চ আদালত থেকে জামিনে এসে বাবাকে হত্যা করেছেন বলে জানিয়েছেন স্বজনরা। এর আগে লবণচরায় তিন ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি হত্যার পেছনেও জামিনে বেরিয়ে আসা অপরাধীর সংযোগের কথা জানিয়েছে পুলিশ।

খুনের পর শুধু একটি পরিবার নয়, গোটা এলাকার মানুষ আতঙ্কের মধ্যে ঢুকে পড়ছে। এ কারণে খুনের শিকার পরিবারগুলোও নির্বিকার হয়ে চুপ থাকছে। তারা মামলা করারও সাহস হারিয়ে ফেলছে। প্রতিবেশী, প্রত্যক্ষদর্শী, সাধারণ মানুষও ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে নীরবতা পালন করছে।

তবু পুলিশ বলছে, ভুক্তভোগী ও সাধারণ মানুষকে মুখ খুলতে হবে, তথ্য দিতে হবে। কিন্তু যে মানুষটি তথ্য দেবেন, তার নিরাপত্তা কে নিশ্চিত করবে, সেই প্রশ্নেরও উত্তর দিতে পারছে না পুলিশ। যার প্রমাণ আক্তার ঢালী। ছেলেকে হত্যা মামলার আসামিরা জামিনে বেরিয়ে হুমকি দেওয়ার পর জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে থানায় ১৫ দিন আগে জিডি করলেও তাকে বাঁচাতে পারেনি পুলিশ; এমনকি তার পরিবারকে নিরাপত্তা দিতে পারেনি।

নগরীর একাধিক বাসিন্দা জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান ও গ্রেফতারের পর অভিযুক্তদের কেউ কেউ অল্প সময়ের মধ্যে কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়ে আসায় মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে। অপরাধীরা দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আসার বিষয়টি আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ হলেও হত্যা মামলার আসামিদের দ্রুত সময়ের মধ্যে জামিন পাওয়ার ঘটনা তাদের অসহায় করে তুলছে।

মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা খুলনার সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট মোমিনুল ইসলাম বলেন, ‘সমাজে নৈতিকতার অবক্ষয় দেখা দিয়েছে। একজন মানুষের জীবন কেড়ে নিতে এখন অপরাধীরা বিন্দুমাত্র চিন্তা করছে না। পারিবারিক নৈতিক শিক্ষা ও অনুশাসনের অভাব এর অন্যতম কারণ। পরিবার থেকেই সন্তানদের নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক মূল্যবোধের চর্চা নিশ্চিত করতে হবে।’

একই কথা বলেছেন কেএমপির ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (সদর) এম এম শাকিলুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘সামাজিক অবক্ষয়ের কারণেই তরুণ সমাজের একটি অংশ অপরাধের দিকে ধাবিত হচ্ছে। আগে পাড়া-মহল্লায় মুরুব্বিদের কথা শোনা হতো। তারা অনেক সময় অশিক্ষিত হলেও এলাকায় সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতেন। এখন সেই সামাজিক অনুশাসন অনেকটাই কমে গেছে। বর্তমানে মুরুব্বিদের সালাম দেওয়ার সংস্কৃতিও হারিয়ে গেছে। যুব সমাজকে সঠিক পথে রাখতে হলে প্রতিটি ঘরে ঘরে বাবা-মাকেই দায়িত্ব নিতে হবে। সামাজিক অনুশাসন মেনে চলতে হবে এবং আগের সামাজিক মূল্যবোধের জায়গায় ফিরে যেতে হবে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস রাখতে হবে।’

গত ১৫ আগস্ট সন্ধ্যায় দুর্জনীমহলের শহীদের মোড়ে ছেলে জয় ঢালীকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় জয়ের মা নাসিমা বেগম বাদী হয়ে ১৩ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। মামলায় গ্রেফতার আসামিরা পরে উচ্চ আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে আসেন। তারা বাদীর স্বামী আক্তারকে ভয়ভীতি দেখিয়ে মামলা তুলে নিতে চাপ দেন। এরপর ৬ অক্টোবর বাড়ির সামনে আক্তার ঢালী নিহত হন। ছেলে হত্যা মামলার আসামিরা জামিনে বেরিয়ে এসে তার বাবাকে হত্যা করেছেন বলে জানান নাসিমা।

নাসিমা বেগম জানান, জয় ঢালী হত্যা মামলা নিয়ে চাপের মধ্যে ছিলেন বাবা আক্তার ঢালী। মামলা তুলে নিতে তাকে বলা হয়েছিল এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছিল। হুমকির পর গত ২১ সেপ্টেম্বর রূপসা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন আক্তার। কিন্তু আসামিরা কীভাবে জামিন পেলেন তা তার জানা নেই।

রূপসা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনোয়ার জাহিদ বলেন, ‘জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে আবেদনের দুদিন পর জিডিটি নথিভুক্ত করা হয়েছিল। রূপসা থানার জিডি নং-১৪১২ তাং-২৩/০৯/২৬।’

রূপসা থানায় করা জিডির আবেদনে আক্তার ঢালী উল্লেখ করেন, গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাত পৌনে ৯টার দিকে সেনরেবাজার এলাকায় মামলার আসামি মুনজিল শেখ, মুরাদ শেখ, মাসুদ মোল্যা ও রোপা মোল্যা তাকে ডেকে নিয়ে যান। তখন মামলা তুলে নেওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের হুমকি-ধমকি দেন তারা। এমনকি জীবনে মেরে ফেলার হুমকি দেন। এ অবস্থায় তিনি ঘটনাস্থল ত্যাগ করে চলে আসেন।

জিডিতে আক্তার ঢালী আরও লিখেন, ‘এর আগে একই আসামিরা আমার ছেলে জয় ঢালীকে দুর্জনীমহলের শহীদের মোড়ে কুপিয়ে হত্যা করেছিল। ওই মামলার আসামিরা হাইকোর্ট থেকে জামিনে এলাকায় এসে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য আমিসহ আমার পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। জানমালের ক্ষতি করবে বলে হুমকি দিচ্ছে। আসামিদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে আমি ও আমার পরিবারবর্গ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতেছি বিধায় আসামিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণসহ আমার জীবনের নিরাপত্তার জন্য জিডি করছি।’

খুলনার পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক বলেন, ‘জয় ঢালী হত্যা মামলার আসামিরা উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়েছেন। জামিনে থাকা ব্যক্তিরা এবং জামিনের পর হুমকির বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে ঘটনার তদন্তে নেমেছে পুলিশ। আক্তার হত্যার ঘটনায় কারা জড়িত এবং কতজন ছিল, সে বিষয়ে ধারণা পাওয়া গেছে। ওই এলাকায় মাদক ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে চিরুনি অভিযান শুরু করেছে পুলিশ।’

বাবা-ছেলে হত্যায় একই ব্যক্তিরা জড়িত কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার বলেন, ‘আক্তার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আগের হত্যার যোগসূত্র আছে বলে আমরা মনে করছি। এর সঙ্গে আরও কোনও বিষয় আছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিক তদন্তে বি কোম্পানির সদস্যরা জড়িত বলে ধারণা করছি। তবে পুরোপুরি নিশ্চিত হতে আরও কিছুটা সময় লাগবে। এখনও কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি।’

লবণচরা থানার আশিবিঘা এলাকায় গত ২১ আগস্ট তিন ঘণ্টার ব্যবধানে খুন হন দুই যুবক। সন্ধ্যায় মঞ্জুরুল ইসলাম (২২) হত্যার তিন ঘণ্টা পর প্রায় ৫০০ গজ দূরে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার হয় নাজমুলের (১৮) লাশ। প্রথম ঘটনায় আশিবিঘা কালভার্টের কাছে মঞ্জুরুলকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় একদল দুর্বৃত্ত।

All Categories