পদ্মায় ভাঙন, বসতঘর সরাতে বাধ্য হচ্ছে স্থানীয়রা

শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়নের আলম খানকান্দি গ্রামে পদ্মায় ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়েছে। গত দুই মাসে এই ভাঙনের ফলে ৩০৩ পরিবার তাদের বসতভিটা হারিয়েছে। নদীর তীরবর্তী আরও অনেক পরিবার ভাঙনের আতঙ্কে তাদের ঘরবাড়ি ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে নিচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ভাঙন চললেও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। এর ফলে একের পর এক বসতবাড়ি, ফসলি জমি, সড়ক ও বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নদীতে বিলীন হচ্ছে।

পাউবো সূত্রে জানা গেছে, পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়নের পাইনপাড়া মৌজায় প্রায় ৩০ বছর আগে চর জেগে ওঠে এবং সেখানে মানুষের বসতি গড়ে ওঠে। বর্তমানে ওই চরের ছয়টি গ্রামে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার মানুষ বসবাস করছেন। চরটির দুই ও তিন নম্বর ওয়ার্ডে গত কয়েক বছর ধরে ভাঙন চলছে।

গত বছর ভাঙনের কারণে দুই নম্বর ওয়ার্ডের আহম্মদ মাঝিকান্দি, মঙ্গল মাঝিকান্দি, আলীম উদ্দিন বেপারিকান্দি ও মাঝিকান্দি গ্রামের বড় অংশ নদীতে বিলীন হয়, যার ফলে প্রায় ১ হাজার ৫০০ পরিবার গৃহহীন হয়। এ সময় ৫২ নম্বর পাইনপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও রেজিয়া আমিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও নদীগর্ভে চলে যায়।

চলতি বর্ষা মৌসুমে আগস্ট থেকে আলম খানকান্দি এলাকায় নতুন করে ভাঙন শুরু হয়েছে। গত দুই মাসে ৩০৩ পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে এবং পাইনপাড়া মৌজার অন্তত ৫ হাজার একর ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে ১২২ নম্বর আলতাফ খান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও।

গতকাল শনিবার আলম খানকান্দি গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, নদীর তীরবর্তী অনেক পরিবার তাদের ঘরবাড়ি ভেঙে অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছে। কারও বসতভিটা ইতোমধ্যে নদীতে বিলীন হয়েছে এবং তারা সড়কের ওপর কিংবা ফসলি জমিতে অস্থায়ীভাবে আশ্রয় নিয়েছে।

১২ বছর আগে পদ্মার ভাঙনে পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়নের মাঝিকান্দি এলাকার বাড়ি হারানো নার্গিস আক্তার আবারও ভাঙনের শিকার হয়েছেন। তিনি বলেন, "আমরা মধ্যবিত্ত কৃষি পরিবার ছিলাম। ১২ বছর আগে সব হারিয়ে আবারও দাঁড়াইছিলাম। এখন সব গেল। জানি না ভাগ্যে কী আছে।"

নাসির কাজী ও তার স্ত্রী সুফিয়া প্রায় ২০ বছর আগে আলম খানকান্দি গ্রামে বসতি গড়েছিলেন। গত সপ্তাহে তাদের জমি ও বসতবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়ায় তারা পাশের একটি ফসলি জমিতে আশ্রয় নিয়েছেন। সুফিয়া বলেন, "এখন কোথায় যাব, কী কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করব এ চিন্তায় ঘুম আসে না।"

কুদ্দুস ব্যাপারী গত ৩০ বছরে চারবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন। তিনি বলেন, "জানিনা কোথায় গিয়ে দাঁড়াব। লেখার মতো আর কোনো ঠিকানা রইল না। এখন থেকে উদ্বাস্তু হয়ে গেলাম।"

পাইনপাড়া চরে ২০২১ সালে প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার পাকা সড়ক নির্মাণ করা হয় এবং সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে পদ্মার তলদেশ দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। তবে নদীভাঙনে প্রায় ২২ কিলোমিটার বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ও প্রায় ৪ কিলোমিটার পাকা সড়ক নদীতে বিলীন হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভাঙনের শিকার ২৭৩ পরিবারের মধ্যে চাল, ডাল ও শুকনা খাবার বিতরণ করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য সাঈদ আহমেদ। পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন খান বলেন, "পদ্মা সেতুর পূর্ব দিকে পাইনপাড়া চরটি অবস্থিত। তিন-চার বছর ধরে চরে ভাঙন দেখা দিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনেক অনুরোধ করেছি, কিন্তু তারা কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।"

ভাঙন প্রতিরোধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এমন অভিযোগের বিষয়ে শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মিল্টন হোসেন বলেন, "আমরা জানি আলম খানকান্দি এলাকায় ভাঙন রয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানানো হয়েছে। তবে চর এলাকায় নদীভাঙন রোধের জন্য জরুরি কোনো কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না।"

All Categories