নয় মাসে মাদ্রাসায় ৭২ ঘটনায় যৌন নির্যাতনের শিকার অন্তত ১০৯ শিশু, বিচার পাচ্ছে না অধিকাংশ

নৈতিক শিক্ষা ও নিরাপদ পরিবেশের আশায় অভিভাবকেরা সন্তানকে মাদ্রাসায় পাঠান। অথচ সেখানেই ছেলেশিশুদের ওপর যৌন নিপীড়ন ও বলাৎকারের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা জাস্টিস মেকার্স বাংলাদেশ ফ্রান্স (জেএমবিএফ)।

সংস্থাটির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় ৭২টি ঘটনায় অন্তত ১০৯ শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মামলা হলেও আইনি সুরক্ষার দুর্বলতা ও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার অভাবে বিচার আটকে আছে।

চলতি বছরের মে মাসে রাজধানীর বনশ্রীর একটি মাদ্রাসা থেকে ১০ বছর বয়সী শিক্ষার্থী আবদুল্লাহর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। যৌন নির্যাতন ও আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে শিশুটির মা মামলা করলে একই মাদ্রাসার এক জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থী গ্রেপ্তার হন। প্রায় সাত মাস পার হলেও মামলার বিচারে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।

জেএমবিএফের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ছেলেশিশুদের ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার অন্তত ১৩১টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় ভুক্তভোগী ১৭১ জন, যাদের মধ্যে ১৬১ জন ধর্ষণের এবং ১০ জন ধর্ষণচেষ্টার শিকার। নথিভুক্ত ঘটনার সিংহভাগ ঘটেছে মাদ্রাসা চত্বরে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ছেলেশিশু নির্যাতনের মামলায় বিচার নিশ্চিত করার পথে বড় বাধা প্রমাণ সংগ্রহের জটিলতা। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, অভিযোগ ওঠার পর শিশুর শারীরিক পরীক্ষা, নমুনা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ এবং ফরেনসিক ফল তৈরির বিষয়ে আলাদা কোনো সুনির্দিষ্ট এসওপি বা নির্দেশনা নেই। ফলে মেডিকেল ও ডিএনএ পরীক্ষার মতো স্পর্শকাতর প্রমাণ যথাযথভাবে আদালতে উপস্থাপন করা যায় না, যা অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পথে বড় আইনি বাধা তৈরি করে।

এছাড়া লোকলজ্জার ভয়ে ছেলেশিশুদের ওপর ঘটা বহু অপরাধ আড়ালেই থেকে যায়। এতে ভুক্তভোগী শিশুরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়।

অধিকারকর্মীরা বলছেন, শুধু শাস্তির বিধানে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রতিরোধমূলক কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। মানবাধিকারকর্মী ফাওজিয়া করিম বলেন, মাদ্রাসাসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের ‘গুড টাচ’ ও ‘ব্যাড টাচ’ সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষক ও অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়ানো এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে পেশাদার কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা রাখা দরকার, যাতে শিশুরা নির্ভয়ে অভিযোগ জানাতে পারে।

বিশেষজ্ঞেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি ও শিশু সুরক্ষা নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছেন।

All Categories