মা ও মেয়ের সম্পর্কের টানাপোড়েন: যোগাযোগের চ্যালেঞ্জ

মা ও মেয়ের সম্পর্কের টানাপোড়েন: যোগাযোগের চ্যালেঞ্জ

মা ও মেয়ের মধ্যে কথোপকথনের সময় বের করা মানে অনেক কিছু। হয়তো মেয়েটি সুখবর দিতে চান অথবা অনেক দিন পর খোলামেলা আলোচনা করতে চান। কিন্তু ফোন ধরতেই মা বলেন, ‘ওহ, ম্যাডাম! এত ব্যস্ত থাকো যে মায়ের সঙ্গে কথা বলারও সময় পাও না!’

এটি হয়তো রসিকতা, কিন্তু মেয়ের কাছে তা অন্য অর্থে ধরা পড়ে। যে ফোনটি আনন্দ ভাগাভাগির জন্য, সেটি হয়ে যায় ব্যস্ততার কৈফিয়ত দেওয়ার উপলক্ষ। কেন সময় দিতে পারেননি, কেন নিয়মিত খোঁজ নেওয়া হয় না—এসব বোঝাতে বোঝাতেই মেয়েকে আবার আশ্বস্ত করতে হয়, মা তার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

এই সম্পর্কের টানাপোড়েন এখানেই। যোগাযোগ করতে এসে মেয়েকে দূরত্ব মেরামতের দায়িত্ব নিতে হয়, যা তার কখনোই তৈরি করার ইচ্ছা ছিল না। একবার এমন হলে হয়তো কিছু আসে যায় না, কিন্তু বারবার একই অভিজ্ঞতা হলে সম্পর্ক ক্লান্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে।

মা-বাবা ও প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের মধ্যে যোগাযোগের প্রত্যাশা সব সময় এক রকম হয় না। অনেক মা-বাবার কাছে ভালোবাসার প্রকাশ মানে নিয়মিত খোঁজ নেওয়া, পরামর্শ দেওয়া এবং পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ থাকা। অপরদিকে, প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েরা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, পারস্পরিক সম্মান এবং নিজেদের সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থা প্রত্যাশা করেন।

গবেষক আসকান কোরনার ও মেরি অ্যান ফিটজপ্যাট্রিক ২০০২ সালে দুই ধরনের পারিবারিক পরিবেশের কথা উল্লেখ করেছেন। একদিকে মতের মিল ও কর্তৃত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, অন্যদিকে খোলামেলা আলোচনা ও ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ থাকে।

এই পার্থক্যকে প্রজন্মের সরল বিভাজন হিসেবে দেখা ঠিক নয়। সব মা-বাবা এক রকম নন, আবার সব প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের প্রত্যাশাও এক নয়। এক পরিবারের সদস্যদের কাছে ভালোবাসা ও সম্মান প্রকাশের অর্থ আলাদা হতে পারে।

যেমন, মেয়ে মাকে রাতের খাবারের দাওয়াত দিলে মা বলেন, ‘বাহ! আমাকে যে তোমার মনে আছে, সেটাই তো জানতাম না!’ হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে অভিযোগ—মেয়ে যথেষ্ট খোঁজ নেন না।

সমাজবিজ্ঞানী আরভিং গফম্যান মানুষের সামাজিক পরিচয় ও আত্মসম্মানের ধারণা ব্যাখ্যা করতে ‘ফেস’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। যখন মা রসিকতার ছলে মেয়ের পরিচয়কে প্রশ্ন করেন, তখন মেয়েকে মন্তব্যটি সহ্য করতে হয় এবং নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হয়।

মেয়ে যদি বলেন, কথাটি তার খারাপ লেগেছে, মা হয়তো পাল্টা বলেন, ‘এখনকার মানুষ একটু কথাও সহ্য করতে পারে না!’ এখানে মায়ের উদ্দেশ্য আঘাত করা ছিল না, কিন্তু কথার প্রভাব যে ভালো হবে, এমন নয়।

গবেষক অ্যালিসন এম. আলফোর্ড ২৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী মেয়েদের সাক্ষাৎকার নিয়ে দেখেছেন, সম্পর্কের দায়িত্ব পালন করা একটি চলমান কাজ। ফোন করা, দেখা করা, মায়ের মন খারাপ হলে তাকে আশ্বস্ত করা—এসবই সেই দায়িত্বের অংশ।

আলফোর্ড এই প্রক্রিয়াকে ‘ডটারিং’ বলে বর্ণনা করেছেন। অনেক মেয়ে সম্পর্কটি সামলে রাখার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেন। এই দায়িত্ব বিভিন্নভাবে প্রকাশ পায়—মেয়ে নিয়মিত ফোন করেন, দাওয়াত দেন এবং যোগাযোগের উদ্যোগ নেন।

সমস্যা তখন হয়, যখন সম্পর্ক ভালো রাখার দায়িত্ব একজনের ওপর পড়ে। একসময় যোগাযোগ কর্তব্য হয়ে যায়। অভিযোগ প্রকাশের পরিবর্তে বলা যায়, ‘তোমার সঙ্গে আরও একটু সময় কাটাতে ইচ্ছে করে।’

যোগাযোগের উদ্যোগকে স্বাগত জানানো উচিত। মেয়ে ফোন করলে প্রথমে তার ব্যস্ততা নিয়ে খোঁচা না দিয়ে বলা যায়, ‘তোমার ফোন পেয়ে ভালো লাগল।’

মা-মেয়ের সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে ২০২১ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, মা-বাবার সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন থাকলে সন্তানরা তাদের পরামর্শকে অনাকাঙ্ক্ষিত মনে করেন।

মা-মেয়ের মধ্যে অভিমান থাকবে, প্রত্যাশার অমিলও থাকবে। মা হয়তো মেয়েকে কাছে পেতে চাইবেন, আর মেয়ে নিজের ব্যস্ততার মধ্যে মায়ের জন্য সময় বের করার চেষ্টা করবেন। দুজনের চাওয়াই সত্যি হতে পারে।

একটি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে দুজনেরই উদ্যোগ প্রয়োজন। একজন বারবার এগিয়ে আসবেন, আর অন্যজন শুধু অভিমান জানাবেন—এভাবে দীর্ঘদিন ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখা কঠিন।

কারণ ভালোবাসা মানে শুধু কাছাকাছি থাকতে চাওয়া নয়; অন্যজন কীভাবে সেই ভালোবাসা গ্রহণ করছেন, সেটিও বোঝার চেষ্টা করা।

সম্পর্কের যত্ন যেন কারও একার দায়িত্ব না হয়। মা-মেয়ে যদি কথার ধরনে একটু মনোযোগী হন, তাহলে অভিমান প্রকাশের জন্য খোঁচা দিতে হবে না এবং ভালোবাসার প্রমাণ দিতেও বারবার কৈফিয়ত দিতে হবে না।

All Categories