খাবার কূটনীতি: জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা ও ইতিহাস পরিবর্তনের পেছনে কিছু ঘটনা
খাদ্য কেবল যুদ্ধাস্ত্র নয়, বরং বিশ্বের ঐতিহাসিক সমস্যার সমাধানে দ্বার উন্মোচনও খাবারের টেবিলে হয়েছে। বৈশ্বিক পরাশক্তির প্রতিযোগিতা ও মিত্রতার কূটনৈতিক বার্তা খুঁজতে খাবারের বিকল্প নেই। ওয়াটার লু যুদ্ধে পরাজয়ের পর ফরাসি কূটনীতিক শার্ল-মরিস নেপোলিয়ানকে বলেছিলেন, ‘আমাকে একজন ভালো রাঁধুনি দিন, আমি আপনাকে ভালো চুক্তি এনে দেব।’ এই জনশ্রুতি পরবর্তী সময়ে পররাষ্ট্রনীতির কৌশলে রূপ নিয়েছে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাসে জাতীয় খাবারকে কৌশলগতভাবে কূটনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অনেক উদাহরণ রয়েছে। পিংপং ডিপ্লোম্যাসি, সিনাই নিয়ে ক্যাম্প ডেভিড কিংবা ব্রিকস আয়োজনে নরেন্দ্র মোদীর নিরামিষ নৈশ-ভোজের আয়োজন; এসবের অন্তর্নিহিত রয়েছে পররাষ্ট্র কৌশলের ইঙ্গিত। মার্কিন বিশেষজ্ঞ পল রকাওয়ার খাবার কূটনীতিকে ‘গ্যাস্ট্রোডিপ্লোমেসি’ (Gastrodiplomacy) হিসেবে অভিহিত করেছেন।
‘খাদ্য কূটনীতি’ বলতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে খাদ্যকে কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করাকে বোঝায়। একাডেমিক আলোচনায় food diplomacy, culinary diplomacy ও gastrodiplomacy—এই তিনটির অর্থ কিছুটা আলাদা। তবে, সহজভাবে বললে, কোনো দেশ অন্য দেশকে খাদ্য সহায়তা দিয়ে, সংকটে খাদ্য পাঠিয়ে বা খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে সহযোগিতার মাধ্যমে সম্পর্ক উন্নত করলে সেটিকে ফুড ডিপ্লোম্যাসি বলা হয়।
Food diplomacy: খাদ্য সহায়তা, মানবিক ত্রাণ ও খাদ্যনিরাপত্তার মাধ্যমে কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরি বা সহযোগিতা।
Culinary diplomacy: রাষ্ট্রীয় ভোজ, নৈশভোজ বা সরকারি অনুষ্ঠানে জাতীয় খাবার পরিবেশনের মাধ্যমে রাষ্ট্র-থেকে-রাষ্ট্র সম্পর্ক জোরদার করা।
Gastrodiplomacy: জাতীয় খাবার ও খাদ্যসংস্কৃতিকে বিদেশি জনগণের কাছে তুলে ধরে দেশের সংস্কৃতি, ভাবমূর্তি ও সফট পাওয়ার বাড়ানো।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে ভারতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস (BRICS) সম্মেলনে বিশ্বনেতাদের জন্য নিরামিষ খাবারের আয়োজন করা হয়, যা ‘খাদ্য কূটনীতি’ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়।
সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির খাদ্য ও রন্ধন কূটনীতি-বিষয়ক গবেষক কেরি ম্যাটউইক বলেন, বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের জন্য পরিবেশিত খাবারের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ভূমিকা থাকতে পারে। এর মাধ্যমে একটি দেশ অন্য দেশের কাছে নিজের বিশেষ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরতে পারে এবং অতিথি নেতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন বা আলাপ-আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
শত শত বছর ধরে খাদ্য একটি দেশের ‘সফট পাওয়ার’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এলেও আধুনিক কূটনীতিতে খাবার জটিল বিরোধের উত্তাপ কমাতে বা সমাধানের পথ তৈরি করতে ভূমিকা রেখেছে।
ফুড ডিপ্লোমেসির আন্তর্জাতিক পরিসরে কিছু উদাহরণ রয়েছে।
ভিয়েনা কংগ্রেস: ফ্রান্সকে রক্ষায় খাদ্য কূটনীতি।
গ্যাস্ট্রোডিপ্লোমেসির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো ১৮১৪-১৫ সালের ভিয়েনা কংগ্রেস। নেপোলিয়ন বোনাপার্টের পরাজয়ের পর ইউরোপের মানচিত্র নতুন করে আঁকতে বিজয়ী শক্তিগুলো ভিয়েনায় সমবেত হয়। সে সময় ফ্রান্সের আশঙ্কা ছিল যে, বিজয়ীদের আগ্রাসী মনোভাবের কারণে দেশটি ভাগ হয়ে যাবে এবং অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হবে।
এই পরিস্থিতিতে কিংবদন্তি ফরাসি কূটনীতিক শার্ল-মরিস দ্য তালিরা খাবারকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। তিনি ফ্রান্সের খ্যাতিমান রাঁধুনি অঁতোয়ান কারেমকে ভিয়েনায় নিয়ে যান। সেখানে প্রতিদিন জমকালো ভোজের আয়োজন হত, যেখানে ফরাসি রন্ধনশৈলীর অসাধারণ খাবার পরিবেশন করা হতো।
মিত্রশক্তির নেতারা এসব খাবারে তৃপ্ত হয়ে ফ্রান্সের প্রতি তুলনামূলক নমনীয় হয়ে ওঠেন। অবশেষে তাদের মধ্যে একটি শান্তিচুক্তি হয়, যার ফলে ফ্রান্স তার যুদ্ধপূর্ব সীমানা ধরে রাখতে সক্ষম হয়।
খাদ্য কূটনীতির আরেকটি উদাহরণ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের জন্মদিন পালন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন রুজভেল্ট, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল এবং সোভিয়েত নেতা জোসেফ স্টালিনের আলোচনা অচলাবস্থায় পড়ে যায়। ১৯৪৩ সালের ২৮ নভেম্বর থেকে ১ ডিসেম্বর ইরানের তেহরানে আয়োজিত সম্মেলন ও চার্চিলের জন্মদিন পালন এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার একটি বড় উদাহরণ।
৩০ নভেম্বর ছিল চার্চিলের ৬৯তম জন্মদিন। ওই দিন একটি নৈশভোজের আয়োজন করা হয়, যেখানে পারস্যের স্যুপ, রুশ ক্যাভিয়ার, আমেরিকান টার্কি, প্রচুর পোল রজার শ্যাম্পেন পরিবেশন করা হয়। চার্চিলের জন্মদিনের কেক মোমবাতি দিয়ে সাজানো হয়েছিল।
এই নৈশভোজে বিগ থ্রি-এর একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া তিন নেতার পারস্পরিক সন্দেহ কমিয়ে দেয়। ওই নৈশভোজের ফল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটে এবং জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়।
চার্চিলের জীবনীকার ম্যাথিউ মিলস স্টিভেনসন লিখেছেন, ‘চার্চিল ডিনার পার্টি ব্যবহার করতেন এমন কিছু অর্জন করতে, যা সবসময় সম্মেলনকক্ষে অর্জন করা সম্ভব হতো না।’
১৯৭২ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের চীন সফরও খাদ্য কূটনীতির আরেকটি উদাহরণ। ১৯৪৯ সালে চীনে কমিউনিস্ট বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল না। ১৯৭২ সালে নিক্সনের ঐতিহাসিক চীন সফরের মাধ্যমে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
১৯৭৮ সালে ক্যাম্প ডেভিডের ঘটনাও খাদ্য কূটনীতির আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ১৯৭৮ সালের ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি ছিল মিশর ও ইসরায়েলের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি ঐতিহাসিক শান্তি-সমঝোতা।
এই চুক্তির মাধ্যমে প্রথম আরব দেশ হিসেবে মিশর ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করে, যা মধ্যপ্রাচ্যের আরব-ইসরায়েল সংঘাতের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ঘটনা।