বিশ্ববিদ্যালয়ে র‍্যাগিংয়ের শিকার ৭৪% শিক্ষার্থী: গবেষণা

নবীন ছাত্রীদের বনভোজনের কথা বলে একটি কক্ষে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে সিনিয়র ছাত্রীরা তাদের চতুষ্পদ প্রাণীর মতো ১০ ধরনের ডাক দিতে বলেন এবং অহেতুক ধমক দেন। ক্যাম্পাসে যাওয়া, ছেলেদের সঙ্গে মেশা ও ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠানো নিয়েও জেরা করা হয়। এক পর্যায়ে এক ছাত্রীর শ্বাসকষ্ট শুরু হয় এবং তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। গত ৮ অক্টোবর পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে।

র‍্যাগিং বা বুলিংয়ের এমন ঘটনা দেশের শিক্ষাঙ্গনে নতুন নয়। এর আগে ৪ জুলাই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ১২ শিক্ষার্থীকে র‍্যাগিংয়ের অভিযোগে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অভিযুক্তরা ৩ জুলাই রাতে কয়েকজন নবীন শিক্ষার্থীকে ডেকে নিয়ে গালাগাল, কান ধরানো এবং ‘ম্যানার’ শেখানোর নামে র‍্যাগিং ও মানসিক নির্যাতন করে।

দেশ-বিদেশের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, জরিপে অংশগ্রহণকারী প্রায় ৭৪ শতাংশ শিক্ষার্থী কখনও না কখনও র‍্যাগিং বা বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন।

গবেষণায় ৯ হাজার ৪৭৪ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৭ হাজার ১১ জনের র‍্যাগিংয়ের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাদের মধ্যে ৪৫ দশমিক ৪ শতাংশ মাঝারি এবং ১১ দশমিক ৯ শতাংশ গুরুতর মাত্রার র‍্যাগিংয়ের কথা জানিয়েছেন। গবেষণায় উদ্বেগ ও বিষণ্নতার উপসর্গ এবং শিক্ষার্থীদের নিজস্ব মূল্যায়নে খারাপ শিক্ষাগত ফলের সম্পর্কও পাওয়া গেছে।

‘বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের র‍্যাগিং: মানসিক স্বাস্থ্য ও শিক্ষাগত সাফল্যের ওপর প্রভাব’ শিরোনামের গবেষণাটি জুনে আন্তর্জাতিক সাময়িকী ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড অ্যাডিকশনের ২৪তম খণ্ডের তৃতীয় সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। গবেষণায় ২০২৪ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত ৫৭ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

গবেষণায় ৯ হাজার ৫৭১টি উত্তর পাওয়া যায়, যার মধ্যে ২ হাজার ৪৬৩ জন র‍্যাগিংয়ের শিকার হননি। তাদের বাদ দিয়ে ৭ হাজার ১১ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় মৌখিক বিদ্রূপ, সামাজিকভাবে হেয় করা, শারীরিক ও অনলাইন হয়রানি এবং যৌন হয়রানির মতো আচরণ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

নারীদের মধ্যে গুরুতর বুলিংয়ের হার ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ, যা পুরুষদের মধ্যে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ৬ হাজার ৬৮৭ জন, যা ৯৫ দশমিক ৪ শতাংশ। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ৩২৪ জন, যা ৪ দশমিক ৬ শতাংশ।

বুলিংয়ের পেছনের কারণ হিসেবে ৭৫ দশমিক ৯ শতাংশ উত্তরদাতা আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। ৬৪ দশমিক ৭ শতাংশ উপহাস বা মজা করা এবং ৫৭ দশমিক ৬ শতাংশ প্রতিশোধের কথা জানিয়েছেন।

গবেষণায় উদ্বেগ ও বিষণ্নতার উপসর্গ পরিমাপে জিএডি-৭ এবং পিএইচকিউ-৯ স্কেল ব্যবহার করা হয়েছে। উদ্বেগের স্কোরে ৪৪ দশমিক ২ শতাংশের মাত্রা মৃদু, ৪০ দশমিক ৯ শতাংশের মাঝারি এবং ১০ দশমিক ৬ শতাংশের গুরুতর ছিল।

গবেষণায় র‍্যাগিংয়ের সঙ্গে উদ্বেগ ও বিষণ্নতার উপসর্গের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এ ফলাফল থেকে র‍্যাগিংকে শিক্ষার্থীদের মানসিক সমস্যার একমাত্র কারণ বলা যায় না।

গবেষণায় ৬৪ দশমিক ৮ শতাংশ শিক্ষার্থী নিজেদের ফল গড়পড়তা বলে জানিয়েছেন। অভিযোগ করেননি এমন শিক্ষার্থীর হার ৭৩ দশমিক ৮১ শতাংশ।

কঠোর শাস্তির পক্ষে ৮১ শতাংশ শিক্ষার্থী বলেছেন, সাময়িক বা স্থায়ী বহিষ্কারের মতো কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। গবেষণার নেতৃত্ব দেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব বার্মিংহাম ও ঢাকার ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ড. শাফায়াত হোসেন। তিনি বলেন, র‍্যাগিং প্রতিরোধে নিয়মিত কর্মশালা ও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।

গবেষণায় প্রতিটি অভিযোগকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা এবং কার্যকর নীতিমালা তৈরির জন্য র‍্যাগিংয়ের সুস্পষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

All Categories