রূপপুরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের তৎপরতা, বিশ্বে পারমাণবিক বিদ্যুতের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে
বাংলাদেশ দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরকে দ্রুত চালুর জন্য তৎপরতা শুরু করেছে, চলমান বিদ্যুৎ গ্রিডের ঘাটতি ও জ্বালানি আমদানির চাপের মধ্যে। একই সময়ে, বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাত নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, ২০৬০ সালের মধ্যে বিশ্বে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তিন গুণেরও বেশি হতে পারে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করতে সরকার আইএইএর সহায়তা চাইছে। কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটের কমিশনিং প্রক্রিয়ায় দুটি নিরাপত্তা ভালভের কারিগরি সমস্যার কারণে বিলম্ব হচ্ছে।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর ভিয়েনায় আইএইএর মহাপরিচালক রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসির সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি তুলে ধরেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তিনি পারমাণবিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়ে বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতির কথাও উল্লেখ করেন।
এর দুই দিন আগে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক বিদ্যুৎ করপোরেশন রোসাটম রূপপুর প্রকল্পের বাকি কাজ দ্রুত শেষ করে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়ে একমত হয়। তবে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সরকার স্বীকার করার পরই রূপপুরের বিদ্যুৎ সরবরাহ দ্রুত করার এই উদ্যোগ নেওয়া হয় যে, দুটি নিরাপত্তা ভালভের সমস্যার কারণে প্রথম ইউনিট কমিশনিংয়ের পরবর্তী ধাপে যেতে পারছে না।
সমস্যাটি পর্যালোচনা করতে রাশিয়ার বিশেষজ্ঞরা আসবেন বলে জানা গেছে। কর্মকর্তারা বলছেন, কারিগরি দিক থেকে কোনটি সম্ভব এবং দ্রুত বাস্তবায়ন করা যাবে—তার ওপর নির্ভর করে ভালভ দুটি পরিবর্তন করা অথবা দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য বরাদ্দ ভালভ ব্যবহার করার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
সমস্যাটি কবে নাগাদ সমাধান হবে, সে বিষয়ে সরকার এখনো নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা দেয়নি। তবে বাংলাদেশে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার খোজিন ১৬ সেপ্টেম্বর জানিয়েছেন, আগামী মাসে রূপপুর থেকে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের আশা করা হচ্ছে। কারিগরি সমস্যাগুলো সমাধানে প্রায় ৪ হাজার রুশ বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলী কাজ করছেন বলেও জানান তিনি।
তবে এই লক্ষ্যমাত্রা কারিগরি কাজ সম্পন্ন করা, কমিশনিং প্রক্রিয়া এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণের ওপর নির্ভর করছে।
রূপপুর প্রকল্পের পরিচালক ড. মো. কবির হোসেন রবিবার সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, কারিগরি সমস্যাগুলো সমাধানে বিশেষজ্ঞ দল কাজ করছে। তবে প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে কখন বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে, তা বলার মতো সময় এখনও আসেনি।
তিনি বলেন, ‘সমস্যাগুলো সমাধানে দলটি কাজ করছে। এই ধাপ শেষ হওয়ার পরও আরও দুই বা তিনটি ধাপের কাজ বাকি থাকবে। ওই ধাপগুলো শেষ হওয়ার পরই বলা সম্ভব হবে জাতীয় গ্রিডে কখন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাবে। বিশেষজ্ঞ দল এ নিয়ে কাজ করছে। এটিই এখন পর্যন্ত সর্বশেষ তথ্য।’
সাম্প্রতিক এই অগ্রগতি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ প্রকল্পটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২৬ সালের ২৮ এপ্রিল রূপপুরের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং শুরু হয়। এর মাধ্যমে চুল্লিটি কমিশনিং পর্যায়ে প্রবেশ করে এবং প্রথমবারের মতো পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের আরও কাছে পৌঁছে বাংলাদেশ।
পাবনায় অবস্থিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে রাশিয়ার তৈরি দুটি ভিভিইআর-১২০০ চুল্লি রয়েছে। প্রতিটি চুল্লির বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। দুই ইউনিট মিলিয়ে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন সক্ষমতা হবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট।
আইএইএ’র সর্বশেষ ‘এনার্জি, ইলেকট্রিসিটি অ্যান্ড নিউক্লিয়ার পাওয়ার এস্টিমেটস’ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ২০২৫ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ২০৬০ সালে ৬৯৬ গিগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে।
২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বিশ্বে ৪১৩টি পারমাণবিক চুল্লি চালু ছিল। এসব চুল্লির সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ৩৭৭ দশমিক ১ গিগাওয়াট।
আইএইএ তার পূর্বাভাসের সময়সীমা ২০৬০ সাল পর্যন্ত বাড়িয়েছে। বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা, জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং কম কার্বন নিঃসরণের বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তার কারণে বিভিন্ন দেশের পারমাণবিক বিদ্যুতের প্রতি বাড়তে থাকা আগ্রহের বিষয়টি এতে প্রতিফলিত হয়েছে।
প্রত্যাশিত এই প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এশিয়ায় হতে পারে। আইএইএর উচ্চ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস অনুযায়ী, মধ্য ও পূর্ব এশিয়ায় পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ২০২৫ সালের ১১৪ গিগাওয়াট থেকে বেড়ে ২০৬০ সালে ৪০৭ গিগাওয়াট হতে পারে।
ছোট মডুলার রিঅ্যাক্টর বা এসএমআরের ভূমিকাও দ্রুত বাড়বে বলে মনে করছে আইএইএ।
রূপপুরে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বড় আকারের চুল্লি ব্যবহার করা হলেও বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাত ক্রমেই ছোট আকারের চুল্লির দিকে নজর দিচ্ছে।
আইএইএর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৬০ সালের মধ্যে বিশ্বে যুক্ত হওয়া নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ২৮ শতাংশ এসএমআর থেকে আসতে পারে।
বাংলাদেশের তাৎক্ষণিক মনোযোগ রূপপুরের দুটি বড় চুল্লিকে ঘিরে। তবে ভবিষ্যতে দেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হলে এসএমআরের দিকে বৈশ্বিক এই পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্যও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে বিশ্বের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বড় একটি অংশ এখন পুরোনো হয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে চালু থাকা প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ চুল্লির বয়স ৩০ বছরের বেশি।
আইএইএ মনে করছে, ২০৬০ সালের মধ্যে এসব পুরোনো চুল্লির অনেকগুলো অবসরে যাবে। ফলে বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের পাশাপাশি পুরোনো উৎপাদন সক্ষমতা প্রতিস্থাপনের জন্যও নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রয়োজন হবে।
শুধু ২০২৫ সালেই বিশ্বে সাতটি পারমাণবিক চুল্লি অবসরে গেছে। একই সময়ে তিনটি নতুন চুল্লি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে এবং আরও ১২টি চুল্লির নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে।
বিশ্ব যখন পারমাণবিক বিদ্যুতের নতুন যুগের দিকে এগোচ্ছে, তখন রূপপুর হবে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় পরীক্ষা—পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুতে রূপ দেওয়া সম্ভব কি না।
বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ পরিকল্পনায় রূপপুরের অবস্থান কয়েক দশকের। ২০১১ সালে কেন্দ্রটি নির্মাণে রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি সইয়ের পর এ কর্মসূচি গতি পায়। এর ধারাবাহিকতায় পাবনার রূপপুরে ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তির দুটি পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণ করা হয়।