পুলিশ কর্মকর্তার সহায়তায় প্রিজনভ্যান থেকে পালিয়ে গেল পিচ্চি রাজা
ঢাকার আদালত থেকে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে ফেরত আনার পথে শীর্ষ মাদক কারবারি রাজা ওরফে পিচ্চি রাজা (৩০) পালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে পুলিশ। তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, পুরান ঢাকার তাঁতীবাজারের পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে প্রিজনভ্যানের তালা খুলে পিচ্চি রাজাকে একটি প্রাইভেটকারে তুলে দেন নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এসআই প্রবীর কুমার বিশ্বাস।
প্রাইভেটকারে পিচ্চি রাজার বোন তাসলিমাসহ অন্যান্য সহযোগীরা ছিলেন। পরে ওই প্রাইভেটকারে চড়ে নিরাপদে পালিয়ে যান ৩০ মামলার আসামি পিচ্চি রাজা। এর আগে পুলিশ দাবি করেছিল, তিনি গাজীপুরের নাওজোড় বা বাইমাইল এলাকায় শৌচাগারে যাওয়ার কথা বলে পালিয়ে গেছেন, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা।
সোমবার (৫ অক্টোবর) জরুরি সংবাদ সম্মেলনে গাজীপুর মহানগর পুলিশের (জিএমপি) কমিশনার মো. ইসরাইল হাওলাদার এসব তথ্য জানান। এ ঘটনায় আসামি পলায়নে সরাসরি সহায়তার অভিযোগে প্রিজনভ্যানের এসকোর্ট ইনচার্জ এসআই প্রবীর কুমার বিশ্বাস, গাড়িচালক নায়েক কামাল হোসেন এবং পিচ্চি রাজার বোন তাসলিমাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ ছাড়া নায়েক কামাল হোসেনের বাড়ি থেকে ৬০ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন জিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন) তাহেরুল হক চৌহান ও অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (অপরাধ) মো. বেলায়েত হোসেনসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা।
গাজীপুর মহানগর পুলিশের কমিশনার ইসরাইল হাওলাদার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘অপরাধী যেই হোক, সে পুলিশ সদস্য হলেও কাউকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। এ ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ ও সঠিক তদন্ত হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২৭ সেপ্টেম্বর সকালে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ২৯ জন আসামিকে প্রিজনভ্যানে করে ঢাকার আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়। আদালতের কার্যক্রম শেষে আসামিদের ফেরত আনার পথে রাত সাড়ে ৮টার দিকে পুরান ঢাকার তাঁতীবাজারের পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে প্রিজনভ্যানটি থামানো হয়।
ভ্যানে থাকা এসকোর্ট ইনচার্জ এসআই প্রবীর কুমার বিশ্বাস চালক নায়েক কামাল হোসেনের কাছ থেকে চাবি নিয়ে ভ্যানের তালা খুলে পিচ্চি রাজা ও খাইরুল বাশার নামের দুই হাজতিকে বাইরে বের করেন। এরপর খাইরুল বাশারকে একটু স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াতের কথা বলে ভ্যানের সামনের অংশে চালকের পাশে বসানো হয়। এরপর পিচ্চি রাজা ও এসআই প্রবীর আর ভ্যানে ওঠেননি।
ইসরাইল হাওলাদার বলেন, ‘পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী সেখানে আগে থেকেই একটি প্রাইভেটকার অপেক্ষমাণ ছিল। সেখানে পিচ্চি রাজার বোন তাসলিমাসহ কয়েকজন অবস্থান করছিলেন। এ সময় সাদা পোশাকে থাকা এসআই প্রবীর নিজে পিচ্চি রাজাকে ওই প্রাইভেটকারে তুলে দিয়ে পলায়নে সহায়তা করেন। এরপর বাকি ২৮ জন আসামিকে নিয়ে প্রিজনভ্যানটি কাশিমপুরের উদ্দেশে রওনা হয়।’
জিএমপির কমিশনার ইসরাইল হাওলাদার বলেন, ‘আসামিকে প্রাইভেটকারে তুলে দেওয়ার পর এসআই প্রবীর কুমার বিশ্বাস কৌশল বদলে পরবর্তীতে গাজীপুর মহানগরীর বাইমাইল এলাকায় নাওজোড় হাইওয়ে থানার সামনে এসে আবার প্রিজনভ্যানে যুক্ত হন। এরপর কাশিমপুর কারাগারে পৌঁছানোর পর দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা মূল ঘটনা গোপন করে দাবি করেন, বাইমাইল বা নাওজোড় এলাকায় পৌঁছালে আসামি পিচ্চি রাজা প্রস্রাব করার কথা বলে গাড়ি থেকে নামেন এবং সুযোগ বুঝে দৌড়ে পালিয়ে যান।’
মিথ্যা তথ্য দেওয়া ও নাটক সাজানোর বিষয়টি ফাঁস হওয়ার পর কোনাবাড়ি থানায় দণ্ডবিধির ২২২৪ ধারায় মামলা করা হয়, যার তদন্তভার পরবর্তীতে জিএমপি ডিবি (দক্ষিণ) বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলা ও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের অভিযোগে প্রিজনভ্যানের দায়িত্বে থাকা এসআই প্রবীর কুমার, নায়েক কামাল হোসেন, কনস্টেবল মো. জাকির হোসেন, কনস্টেবল মো. সাকিব এবং কনস্টেবল শাকিল হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করে বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে। গ্রেফতার হওয়া দুই পুলিশ সদস্য ছাড়া বাকি তিন কনস্টেবলকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
এদিকে, ঘটনার আট দিন পার হলেও পলাতক শীর্ষ মাদক কারবারি পিচ্চি রাজাকে এখনও গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। তাকে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য সহযোগীদের গ্রেফতারে ঢাকা ও গাজীপুরের বিভিন্ন সম্ভাব্য স্থানে ডিবি পুলিশের একাধিক টিম অভিযান চালাচ্ছে।
পিচ্চি রাজা ওরফে বাদশা (৩৪) ঢাকার মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের (ব্লক-এ, বাসা-১১৭) এলাকার মোতালেবের ছেলে। তিনি রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার শীর্ষ মাদক কারবারি হিসেবে পরিচিত এবং তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদক সংক্রান্ত ৩০টি মামলা রয়েছে। চলতি বছরের ১৯ মে নেপাল থেকে দেশে ফেরার পথে ঢাকা বিমানবন্দর এলাকায় ইমিগ্রেশন পুলিশের সহায়তায় তাকে, তার স্ত্রী ও শ্যালককে গ্রেফতার করে পুলিশ।