পুলিশ বাহিনীতে শৃঙ্খলা রক্ষায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পুলিশ বাহিনীতে শৃঙ্খলা রক্ষার প্রশ্নে কঠোর বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, কোনও পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ থাকলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে একই ঘটনায় ফৌজদারি অপরাধের উপাদান থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে প্রচলিত ফৌজদারি আইনের আওতায় বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে পুলিশ পদক প্রদান অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। সাহসিকতা, বীরত্ব, সেবায় অনন্য অবদান, গুরুত্বপূর্ণ মামলার তদন্ত ও উদ্ভাবনী কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতিস্বরূপ আইজিপিসহ ৯২ পুলিশ সদস্যকে চার ক্যাটাগরিতে পদক দেওয়া হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “শুধু বিভাগীয় শৃঙ্খলামূলক কার্যক্রমের মধ্যে আমরা সীমাবদ্ধ থাকবো না। সঙ্গে যদি কোনও ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে, তাহলে সেটির জন্যও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, “দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ‘গুড ফেইথ’ বা সৎ উদ্দেশ্যে ছোটখাটো ভুল হলে সেটি সেই বিবেচনায় দেখা হবে। তবে ইচ্ছাকৃত অনিয়ম, দায়িত্বে অবহেলা বা অপরাধের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলামূলক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “কোনও পুলিশ কর্মকর্তা, তিনি যে পদমর্যাদারই হোন না কেন, জনপ্রত্যাশা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হলে তার পরিণতি ভালো হবে না।”
তিনি পুলিশকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্তভাবে আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, “বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে পুলিশের কাজে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকবে না।”
সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় আগামী সপ্তাহে বাংলাদেশ পুলিশের স্বতন্ত্র ‘সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট’ চালু করা হবে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, একজন অতিরিক্ত আইজিপির নেতৃত্বে এই ইউনিট পরিচালিত হবে এবং মহানগর, বিভাগ ও জেলা পর্যায়েও এর কার্যক্রম বিস্তৃত করা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আগামী সপ্তাহে একটি আলাদা সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট চালু করা হবে। এর সদর দফতরে একজন অতিরিক্ত আইজিপির পদ থাকবে। পদটি না থাকলে আমরা সৃষ্টি করবো।”
তিনি ইউনিটটিতে আধুনিক প্রযুক্তির সরঞ্জাম সংযোজনের কথা জানিয়ে বলেন, “জটিল সাইবার অপরাধের তদন্ত ও বিশ্লেষণ কেন্দ্রীয় পর্যায়ে হবে। তবে স্থানীয় পর্যায়ে যেসব অপরাধ বিশ্লেষণ করা সম্ভব, সেগুলো স্থানীয় পর্যায়েই সম্পন্ন করার সক্ষমতা তৈরি করা হবে।”
সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। ২১ সেপ্টেম্বর পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে পাঠানো মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে ইউনিটটির কার্যক্রম শুরুর কথা বলা হয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে অপরাধের ধরনও দ্রুত বদলাচ্ছে। সাইবার স্পেস ব্যবহার করে সংঘটিত অপরাধ এখন আধুনিক অপরাধপ্রবণতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।”
তিনি বলেন, “অনেক দেশে প্রতারণা ও সাইবারনির্ভর অপরাধ মোট অপরাধের বড় অংশ হয়ে উঠছে। সে কারণে বাংলাদেশকেও এই খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।”
এর আগে ১৫ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি ও কম্পিউটার সায়েন্সে দক্ষ পুলিশ সদস্যদের কাজে লাগিয়ে সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “প্রযুক্তি যতই আধুনিক হোক, পুলিশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মানুষের আস্থা। জনগণের আস্থা ছাড়া কোনও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে না।”
তিনি পুলিশের সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, “আপনারা কতটা সফল হয়েছেন, কতটা মানুষের আস্থা অর্জন করতে পেরেছেন, নিজেরা বিচার করুন।”
তিনি বলেন, “জনগণের সঙ্গে সম্মানজনক ও মানবিক আচরণ করতে হবে, মানুষের কথা শুনতে হবে এবং সমস্যাকে গুরুত্ব দিতে হবে।”
লিখিত বক্তব্যে ‘জুলাই বিপ্লব’ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বিপ্লব সংঘটিত হয় সমাজ, অর্থনৈতিক কাঠামো ও মৌলিক সাংবিধানিক পরিবর্তনের জন্য। আমাদের এখানে গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা, নাগরিক ও সাংবিধানিক অধিকার এবং গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পাওয়ার দাবিতে।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “২০২৪ সালের ঘটনাকে ‘জুলাই ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান’ হিসেবে অভিহিত করার পক্ষে আমি।”
পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য নির্ধারণ করে দিয়ে তিনি বলেন, “২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর আসার আগেই আপনাদের সেই পরিবর্তন দেখাতে হবে।”
সরকার ‘রিওয়ার্ড অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ নীতি অনুসরণ করবে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “যারা দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনবেন, তাদের পুরস্কৃত করা হবে।”