চুয়াডাঙ্গার কালিয়াবকরী গ্রামে মসজিদ-মন্দিরের পাশাপাশি সম্প্রীতি ও ঐক্যের উদাহরণ
ভৈরব নদঘেঁষা চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার শান্ত ও সুনিবিড় গ্রাম কালিয়াবকরী। দেশের অন্যান্য সাধারণ গ্রামের মতো মনে হলেও, এই গ্রামটি অসাম্প্রদায়িক চেতনার একটি অনন্য ইতিহাস বহন করে। একদিকে পবিত্র আজানের সুর, অন্যদিকে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শঙ্খ ও উলুধ্বনি শোনা যায়। একই আঙিনায় মহান আল্লাহর ইবাদতগাহ জামে মসজিদ এবং পাশেই একটি মন্দির দাঁড়িয়ে আছে। এখানে কোনো বিভেদ নেই, বরং একসঙ্গে ধর্ম পালন করে কালিয়াবকরী গ্রামের মানুষ সম্প্রীতির এক নজির স্থাপন করেছেন।
যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই ধর্মীয় সৌহার্দ্য চুয়াডাঙ্গা ছাড়িয়ে এখন পুরো দেশের জন্য একটি দৃষ্টান্ত। কালিয়াবকরী গ্রাম যেন শান্তির বাতাস—যেখানে ধর্মের ভিন্নতা মানুষকে দূরে ঠেলে দেয়নি, বরং পরম ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে বেঁধেছে। উৎসবের দিনগুলোতে পুরো গ্রামে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, কালিয়াবকরী গ্রামে বহু বছর ধরে মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করছেন। ১৯৯০ সালে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের জন্য কালিয়াবকরী রামকৃষ্ণ মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে, ২০১৬ সালে মুসলিমদের নামাজের সুবিধার জন্য মন্দিরের পাশেই নির্মিত হয় একটি জামে মসজিদ। দুই ধর্মের মানুষ একই জমি ভাগ করে নিয়েছেন। একপাশে মুসল্লিরা নামাজ আদায় করেন, অপর পাশে চলে সনাতন ধর্মের পূজা-অর্চনা ও আরতি।
কালিয়াবকরী গ্রামের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, "আমাদের এখানে হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। আমরা একে অপরের সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়াই এবং আনন্দের সঙ্গে একে অপরের ধর্মীয় উৎসব উদযাপন করি।" ঈদের আনন্দ যেমন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ছুঁয়ে যায়, তেমনি দুর্গাপূজা বা অন্য উৎসবে মুসলিম প্রতিবেশীরাও অংশগ্রহণ করেন।
কালিয়াবকরী পূর্বপাড়া জামে মসজিদের সভাপতি আব্দুস সাত্তার বলেন, "এখানে কখনো কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা বা ভুল-বোঝাবুঝি হয়নি। আমরা নামাজ পড়ার সময় সনাতন ধর্মের ভাইয়েরা তাদের মাইক বা বাদ্যযন্ত্র বন্ধ রাখেন এবং তাদের পূজার সময় আমরা সহযোগিতা করি। আমাদের কাছে সম্প্রীতিই আসল।"
কালিয়াবকরী শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ মন্দিরের সভাপতি শ্রী রতন হালদার বলেন, "এখানে মুসলিম ও হিন্দু ভাইদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। আমরা যুগ যুগ ধরে মিলেমিশে আছি। আমাদের পূর্বপুরুষেরা যেভাবে মিলেমিশে ছিলেন, আমরাও সেই ধারা বজায় রাখছি। মসজিদ ও মন্দিরের কারণে আমাদের সম্পর্ক আরও মধুর হয়েছে।"
দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লাভলী ইয়াসমিন বলেন, "কালিয়াবকরী গ্রামের সম্প্রীতির চিত্র প্রমাণ করে যে, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও ভালোবাসা থাকলে যে কোনো ভেদাভেদ ভুলে একসাথে সুন্দর সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। এই গ্রামের অসাম্প্রদায়িক চেতনার আলো ছড়িয়ে পড়ুক সারা দেশে।