ফেনীতে দেড় হাজার কোটি টাকার প্রকল্প উদ্বোধন করতে আসছেন প্রধানমন্ত্রী
দীর্ঘদিনের বন্যা, নদীভাঙন ও পানিবদ্ধতার সমস্যার সমাধানে ফেনীর মানুষের জন্য প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার বহুল প্রত্যাশিত মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন কাজের উদ্বোধন করতে আজ বৃহস্পতিবার ফেনী সফরে আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এটি তার প্রথম ফেনী সফর। সফরের মূল কেন্দ্রবিন্দু হবে ফুলগাজী ও পরশুরাম। ফেনী শহরে কোনো জনসভা বা পথসভায় অংশ নেবেন না তিনি। সকাল সাড়ে ৮টায় প্রধানমন্ত্রী নিজ বাসভবন থেকে সড়কপথে পরশুরামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেবেন। দুপুর সাড়ে বারোটায় পরশুরামের খেয়াঘাট মুহুরী ব্রিজ সংলগ্ন চরে "মুহুরী, কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন (১ম পর্যায়)" শীর্ষক প্রকল্পের মূল কর্মসূচিতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে উদ্বোধন করবেন।
এরপর তিনি ফুলগাজী উপজেলায় মায়ের স্মৃতিবিজড়িত বেগম খালেদা জিয়া মহিলা কলেজ মাঠে বৃক্ষরোপণে অংশ নেবেন। ফুলগাজী উপজেলায় জেলা পরিষদ ডাকবাংলোতে গিয়ে রুফটপ সোলার থেকে জাতীয় গ্রীডে বিদ্যুৎ সরবরাহের উদ্বোধন করবেন। বিকালে ফুলগাজী পাইলট হাইস্কুল মাঠে একটি জনসভায় কৃষক ও ফ্যামিলি কার্ড, মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেমসহ অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ের সেবকদের মাঝে সম্মানি প্রদান করবেন।
প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে পরশুরাম ও ফুলগাজীসহ পুরো জেলায় ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে মুহুরী নদীর তীরবর্তী ঘাটঘর এলাকায় প্রকল্প উদ্বোধনের স্থান প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক, সামাজিক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে এ সফর নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে। ফেনীর নদীপাড়ের মানুষের কাছে মুহুরী-কহুয়া প্রকল্পটি একটি উন্নয়ন প্রকল্পের চেয়ে বেশি, এটি দীর্ঘদিনের বন্যা ও পানিবদ্ধতার সমস্যার স্থায়ী সমাধানের প্রত্যাশা। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে মুহুরী ও কহুয়া নদীর পানি বৃদ্ধি এবং বাঁধের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে পরশুরাম, ফুলগাজী ও আশপাশের এলাকায় বারবার বন্যা দেখা দেয়। ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যার পর এ অঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে।
চলতি বছরের ১৬ জুন একনেক সভায় ১ হাজার ৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৬৭ দশমিক ৯২ কিলোমিটার বাঁধ পুনর্বাসন, ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ, ৮৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার নদী ও জলাধার পুনঃখনন, ২৭টি সেচ অবকাঠামো পুনর্বাসন এবং ৭৭টি ইনলেট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
পানি উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বন্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পানি নিষ্কাশন ও কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা বাড়বে। নদী ও জলাধার পুনঃখননের ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে বাঁধ পুনর্বাসন ও নদীতীর সংরক্ষণের মাধ্যমে ভাঙন এবং বন্যার ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রকল্পটির কাজ ২০৩০ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, প্রকল্পের কাজ যেন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে। টেকসই ও মানসম্মতভাবে বাঁধ নির্মাণ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং নদী-খাল-জলাধারের পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ অতীতে বাঁধের দুর্বলতা ও পানি নিষ্কাশনের সমস্যার কারণে বর্ষায় ফসলি জমি, বসতবাড়ি ও সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে ঘিরে ফেনীর মানুষের প্রত্যাশার তালিকা দীর্ঘ। বন্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ফেনীতে মেডিকেল কলেজ, প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, উন্নত চিকিৎসাসেবা, কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন, সড়ক যোগাযোগ ও নদী ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দাবি রয়েছে। তবে মুহুরী-কহুয়া প্রকল্পের উদ্বোধনকে নদীপাড়ের মানুষের কাছে সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশার একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ফেনী পৌর বিএনপির সদস্যসচিব অ্যাড. মেজবাহ উদ্দিন জানান, প্রধানমন্ত্রী তার সফরের প্রথমে মূল কর্মসূচি উদ্বোধন করতে পরশুরামে যাবেন। এর আগে নেতাকর্মীদের কোনো প্রদর্শনী বা পথসভা না করার জন্য দলীয় নির্দেশনা রয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, ফেনীর নদী ও বন্যার ইতিহাস দীর্ঘ; তাই একটি প্রকল্পের উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে কাজের শেষ নয়, বরং শুরু হবে নতুন অধ্যায়ের। এখন মানুষের প্রত্যাশা, দেড় হাজার কোটি টাকার এই বৃহৎ প্রকল্প যথাযথ পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা ও মান বজায় রেখে বাস্তবায়িত হবে এবং একদিন বন্যা-ভাঙনের আতঙ্ক থেকে ফেনীর নদীপাড়ের মানুষ স্থায়ী স্বস্তি পাবে।