Oct 16, 2026
মেসির নামে নতুন উদ্ভিদ, প্রকৃতির মাঝে আর্জেন্টিনার ছোঁয়া

মেসির নামে নতুন উদ্ভিদ, প্রকৃতির মাঝে আর্জেন্টিনার ছোঁয়া

ফুটবল, শিক্ষা ও বিজ্ঞান কি কখনো এক সুতোয় গাঁথা সম্ভব? কখনো কখনো কারো জন্য সেটা সম্ভব হয়। চলতি মাসেই জাতীয় দল থেকে অবসর নেন লিওনেল মেসি। তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি দেয় বুয়েনস আইরেস বিশ্ববিদ্যালয়। এবার পেরুর দক্ষিণ-মধ্য অঞ্চলে সমতলভূমি থেকে প্রায় ২ হাজার ৪০০ মিটার উঁচুতে জন্ম নেওয়া একটি সুগন্ধি গাছের ফুলের নাম মেসির নামে রেখেছেন দেশটির একদল বিজ্ঞানী।

আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যম লা নাসিওন জানিয়েছে, বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন, আন্দিজ পর্বতমালায় জন্ম নেওয়া এই উদ্ভিদ বিজ্ঞানের কাছে এত দিন অচেনা ছিল। মেসির সম্মানে উদ্ভিদটির নামকরণ করা হয়েছে ‘সালভিয়া মেসি’ (salvia messii)।

আন্দিজ পর্বতমালার যে অংশ পেরুতে অবস্থিত, সেখানে পাথুরে ঢালে জন্ম নেওয়া এই উদ্ভিদের পাপড়িগুলো নীল ও সাদা রঙের। একদল উদ্ভিদ গবেষক এই ফুল গাছটির অনন্য কিছু বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করেন। এটি ল্যামিয়াসি (Lamiaceae) পরিবারের একটি গুল্মজাতীয় সুগন্ধি উদ্ভিদ। এই একই পরিবারে তুলসী, পুদিনা, রোজমেরি এবং সাধারণ সেজের মতো গাছগুলো রয়েছে।

পেরুর সান মার্কোস জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক ইতিহাস জাদুঘরের পল গঞ্জালেস, আর্জেন্টিনার স্বাধীন গবেষক রোলোন্দো উরিয়া এবং পেরুর হুরারাঙ্গো নেচারের জ্যঁ কাপচা-রামোস এই প্রজাতির উদ্ভিদটি আবিষ্কার ও বর্ণনা করেন। তাঁরা বৈজ্ঞানিক জার্নাল ফাইটোতাক্সায় তাঁদের গবেষণা প্রকাশ করেছেন।

মায়মোনাইডস ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ন্যাচারাল, এনভায়রমেন্টাল অ্যান্ড অ্যানথ্রোপোলজিক্যাল সায়েন্সেস এবং আজারা ফাউন্ডেশনের গবেষক ক্লদিও বের্তোনাত্তি বলেন, ‘বৈজ্ঞানিক গবেষণা মানুষেরই সৃষ্টি, তাই কোনো প্রকৃতিবিদ বা বিজ্ঞানী লিওনেল মেসি ব্যক্তিত্বের মতো গুণাবলি ও আবেগের পরিমণ্ডলের বাইরে গিয়ে কাজ করেন না। এটিই ব্যাখ্যা করে, কেন বিভিন্ন অঞ্চলের এবং ভিন্ন ভিন্ন প্রাণী বা উদ্ভিদ নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা এই শ্রদ্ধাঞ্জলিতে এক হয়েছেন, যা তাঁর নামকে অমর করে রাখবে।’

আর্জেন্টিনাকে বিদায়ের পর ক্লাব ফুটবলে প্রথম ম্যাচেই জোড়া গোল মেসির। তবে আর্জেন্টিনার জার্সিতে সর্বোচ্চ গোলদাতার নামে কোনো প্রজাতির নাম রাখার ঘটনা এই প্রথম নয়। আর্জেন্টিনার সালতায় বারিতু জাতীয় পার্কে আবিষ্কৃত একটি ছত্রাকের নাম রাখা হয় ‘সেরকোপেমসেস মেসি’। সেখানে পাতাগোনিয়ান প্রজাতির মাকড়সার নাম ‘আকান্থোগোনাটাস মেসি’, পুনা অঞ্চলে টিকটিকির নাম ‘লিওলায়েমুস মেসি’, আন্দেজের প্রাগৈতিহাসিক শকুনের নাম রাখা হয় ‘ভালচার মেসি।’ ঝিনুকের মতো দেখতে প্রাগৈতিহাসিক খোলসি একটি প্রাণীর নাম ‘ডিস্কনিস্কা মেসি।’

রয়্যাল হর্টিকালচারাল সোসাইটি অব লন্ডনের পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষিবিদ ও উদ্ভিদ প্রজননবিদ রোলোন্দো উরিয়া কয়েকজন অপেশাদারের শেয়ার করা রেকর্ড পর্যবেক্ষণ করার সময় অদ্ভুত এক বিষয় লক্ষ করেন—পেরুর উচ্চভূমি অঞ্চলে জন্ম নেওয়া একটি গুল্মজাতীয় উদ্ভিদের ছবি বইয়ে নথিভুক্ত কোনো প্রজাতির সঙ্গেই মিলছে না! সন্দেহের বশে উরিয়া যোগাযোগ করেন লিমার ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের বিশিষ্ট পেরুভিয়ান উদ্ভিদবিদ পল গঞ্জালেস এবং জীববিজ্ঞানী জ্যঁ কাপচা রামোসের সঙ্গে। আনুষ্ঠানিক গবেষণার জন্য তাঁরা সবাই মিলে একটি দল গঠন করেন। তাঁরা ঐতিহাসিক আর্কাইভ পর্যালোচনা করে বৈজ্ঞানিক সংগ্রহশালার নমুনাগুলো গবেষণা করেন এবং পর্বতমালাটির সবচেয়ে দুর্গম ও কঠিন ঢালগুলোয় বহু বছর অভিযানের আয়োজন করেন। ভালোভাবে পর্যবেক্ষণের তাঁরা পরিষ্কার ধারণা পেয়ে যান—দেড় মিটার পর্যন্ত উঁচু শক্তপোক্ত গুল্মজাতীয় উদ্ভিদটিকে এর আগে কেউ শ্রেণিবদ্ধ করেনি।

নতুন আবিষ্কৃত কোনো উদ্ভিদের নামকরণ ইচ্ছেমতো করা যায় না। সে জন্য আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। যখন কোনো ব্যক্তিত্বের সম্মানে কোনো প্রজাতির নামকরণ করা হয়, তখন বিজ্ঞানীরা একটি লাতিন ব্যাকরণগত নিয়ম অনুসরণ করেন, যেখানে পদবির শেষে একটি ‘আই’ (i) যোগ করা হয়। এর অর্থ হলো—‘মেসির উদ্ভিদ’।

এই ফুলের দারুণ একটি বিষয় হলো, ফুল ফোটার পর এর পাপড়িগুলোয় সাদা ও অত্যন্ত কোমল হালকা নীলের এক অনন্য মিশ্রণ দেখা যায়। তাতে ফুটে ওঠে আর্জেন্টিনা দলের জার্সির রং। আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জন্য এ যেন প্রকৃতির উপহার দেওয়া পোস্টকার্ড।

কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই প্রকৃতি যেন শেষ পর্যন্ত এক আর্জেন্টাইন পোস্টকার্ড উপহার দিয়েছে, যা সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলারকে যুক্ত করেছে আন্দিজের জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে.

All Categories