‘এটা সহজ ছিল না’, চুক্তি স্বাক্ষরের পর ট্রাম্প

প্রায় চার মাসের সংঘাত বন্ধে একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান।  মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার ইরানি প্রতিপক্ষ মাসুদ পেজেশকিয়ান সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছেন। জি৭ শীর্ষ সম্মেলনের পর ভার্সাই প্রাসাদে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাখোঁর সঙ্গে নৈশভোজের সময় ট্রাম্প এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন।

চুক্তি স্বাক্ষরের কিছুক্ষণ আগে হাতে কলম নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সঙ্গে বসে থাকা নেতাদের বলেন, ‘এটা সহজ ছিল না, এটুকু আমি বলতে পারি।’ এরপর তিনি কাগজে স্বাক্ষর করে সেটি অতিথিদের সামনে তুলে ধরেন।একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ট্রাম্পের পাশে বসে আছেন ইমানুয়েল ম্যাখোঁ।পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ অন্যান্য অতিথিরা, যারা হাততালি দিচ্ছিলেন।

প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এসে সাংবাদিকদের বলেন ডোনাল্ট ট্রাম্প বলেন, ‘আমি মাত্র স্বাক্ষর করেছি।’ ভারতে ইরান দূতাবাসও শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষরিত নথি হাতে থাকা মাসুদ পেজেশকিয়ানের ছবি প্রকাশ করেছে।১৪ দফা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তিতে তাৎক্ষণিকভাবে সামরিক অভিযান বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে, যার মধ্যে লেবাননের সংঘাতও অন্তর্ভুক্ত।

দুই দেশ ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর অঙ্গীকার করেছে। চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা, ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং জব্দ করা ইরানি সম্পদ ফেরত দেওয়ার বিষয়ও রয়েছে।এ ছাড়া ইরানের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মসূচির কথাও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

মেমোরেন্ডামে বলা হয়েছে, ইরান আবারও নিশ্চিত করেছে, তারা কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জন করবে না। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার তত্ত্বাবধানে ভবিষ্যতে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ নিয়ে আলোচনা করার কথাও এতে উল্লেখ রয়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাকাই বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে এবং এখন এর বাস্তবায়ন পরীক্ষা করার সময়।তিনি বলেন, ‘ইসলামাবাদ মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং-এর চূড়ান্ত পাঠ দুই প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। এখন চুক্তিটি কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হয়, তা পরীক্ষা করার সময়।’

ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ রাষ্ট্রীয় প্রেস টিভিকে বলেন, ‘তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শক্ত অবস্থান থেকে কূটনৈতিক আলোচনা চালাচ্ছেন।’

তিনি আরো বলেন, ‘বর্তমান আলোচনা আগের সময়ের চেয়ে আলাদা। এখন সামরিক বিজয়ের পর পাওয়া অবস্থানকে ভিত্তি করে আলোচনা হচ্ছে।’ তার মতে, কোনো যুদ্ধ শেষ হলে সেই বিজয় যদি রাজনৈতিক ও আইনি চুক্তিতে না আসে, তাহলে তার কোনো বাস্তব লাভ থাকে না।

চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, ‘ইরান চুক্তি লঙ্ঘন করলে তিনি তাদের ওপর কঠোর হামলা চালাবেন।’ তিনি বলেন, ‘আমি চাই না তারা তা করুক। আমি চাই তারা চুক্তি মেনে চলুক।’

এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প ইরানের জনগণকে ‘বুদ্ধিমান’ বলে উল্লেখ করেন এবং দাবি করেন, এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আনবে এবং তেলের দাম কমাতে সাহায্য করবে।

বিশ্ব নেতাদের প্রতিক্রিয়া

ইমানুয়েল ম্যাখোঁ বলেন, ‘এই চুক্তি স্থায়ী শান্তির পথ খুলে দেবে এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর সুযোগ তৈরি করবে। তার মতে, এতে জ্বালানির দামও কমতে পারে, যা সাধারণ মানুষের জন্য ইতিবাচক হবে।’

অন্যদিকে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে। দেশটি এই সংঘাতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছিল। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ এক্সে দেওয়া পোস্টে বলেন, ‘এই চুক্তি দেখায় যে দুই পক্ষ আলোচনার মাধ্যমে সংঘাত সমাধানে অঙ্গীকারবদ্ধ।’

তিনি বলেন, ‘ইসলামাবাদ মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং অবিলম্বে কার্যকর হবে। প্রথম ধাপে ইরান সঙ্গে সঙ্গে হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে এবং যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে।’

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, তার কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রতি অটল অবস্থান আবারও এমন একটি সংঘাত শেষ করতে সাহায্য করেছে, যা পুরো অঞ্চল এবং তার বাইরেও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারত।
 

All Categories