আহসান কবির
আহসান কবির
Dec 13, 2025 104 views

ভালোবাসার দিকে হাঁটলোই না বাংলাদেশ!

এই রাষ্ট্র আজও ভালোবাসার দিকে হাঁটতে শিখতে পারেনি।যে রাষ্ট্র নিজেই ঘৃণার চাষ করে, সেখানে নাগরিকেরা ধীরে ধীরে সন্দেহবাতিক হয়ে ওঠে। কারও কথাবার্তা বা আচরণ ভালো না লাগলেই আমরা হয়তো কুৎসা রটাতে দ্বিধা করি না। বহুবার বলা হয়েছে, আবারও বলা প্রয়োজন—ঘৃণার কারণে কখনো কারও শাস্তি হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না। কিন্তু ভালোবাসার কারণে এ পর্যন্ত বহু মানুষ শাস্তির মুখোমুখি হয়েছেন, ভবিষ্যতেও হবেন।

নিজের মতবাদ ও বিশ্বাস নিয়ে দেশকে ভালোবাসতে গিয়ে ‘ইনকিলাব মঞ্চ’খ্যাত শরীফ ওসমান হাদী আজ জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দুলছেন। অথচ এই নির্মম ঘটনার পরও পক্ষ–বিপক্ষের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে ঘৃণার চাষ থামেনি। বরং একে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে সেই চাষ আরও বাড়ানো হচ্ছে।

আমরা কেউই এই প্রবণতার বাইরে নই। হাদী ভারত ও আওয়ামী লীগের সমালোচনা করে বহু কথা বলেছেন—হতে পারে তাঁর ভাষা সব সময় শালীন ছিল না। কিন্তু তাঁর গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে অশালীন ও নেতিবাচক মন্তব্য ছড়িয়েছে, তা তার চেয়েও কয়েক গুণ বেশি নৃশংস।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দোষ চাপানোর রাজনীতি—ব্লেম গেম। প্রথমে দায় চাপানো হয়েছে পলাতক আওয়ামী লীগের ওপর। এরপর আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বর্তমানের ‘সহজ শত্রু’ হিসেবে বিএনপি ও তাদের নেতা মির্জা আব্বাসকে দায়ী করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ‘ফয়সাল’ নামে যাকে অভিযুক্ত খুনি বলা হচ্ছে, তার রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও পরস্পরবিরোধী তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। কেউ বলছেন, সে ছাত্রলীগ করত। আবার কেউ বলছেন, সে কখনোই ছাত্রলীগের কর্মী ছিল না। কেউ বলছেন, পাঁচ আগস্টের পর বিদেশি পিস্তল ও বুলেটসহ ধরা পড়েও সে জামিন পেয়েছে, তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলাও আছে।
এই সব অভিযোগ, সমালোচনা ও গুজব মিলেই মূলত ঘৃণার চাষকে আরও উসকে দেয়।

গত ২৫–৩০ বছর ধরে আমরা আরেকটি পরিচিত গল্প শুনে আসছি—বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের গল্প। ‘ট্যারা খোকন’ গ্রেপ্তারের পর অস্ত্র উদ্ধারের নামে গোলাগুলি, গুলিবিদ্ধ হওয়া, হাসপাতালে মৃত্যু—এই গল্প নতুন নয়। এটি এমন এক বয়ান, যার মাধ্যমে রাষ্ট্র নিজেই খুনিকে পরিণত হয়। অথচ ঘৃণা ছাড়া কেউ খুনি হয়ে উঠতে পারে না।

শরীফ ওসমান হাদীর দশ মাস বয়সী একটি সন্তান আছে। আল্লাহ না করুন—হাদীর যদি কিছু হয়ে যায়, এই শিশুটি কীভাবে বড় হবে? এই পৃথিবী ও দেশ তার কাছে কী রকম হয়ে উঠবে? তার মনেও কি জন্মাবে না ঘৃণা? প্রচলিত সিনেমার বাস্তবতায় বড় হয়ে যদি সে বাবার হত্যার প্রতিশোধ নিতে চায়, যদি তার মাথায় সব সময় খুনের চিন্তা ঘুরতে থাকে—তখন দায় নেবে কে?

নিজের বিশ্বাস ও মতবাদ নিয়ে দেশকে ভালোবাসতে গিয়ে যে হাদী আজ চরম যন্ত্রণা ভোগ করছেন, তার সন্তানের জন্য আমরা কী রেখে যাচ্ছি? সমালোচনার গল্প? অদেশপ্রেমের তকমা? নাকি দোষ চাপানোর নামে আরও ঘৃণা?

হাদী যেভাবে তার দশ মাস বয়সী সন্তানকে কাঁধে তুলে আল্লাহর আরশ, আকাশ ও দেশের কাছে সমর্পণের ভঙ্গিতে ছবি তুলেছেন—এই রাষ্ট্র কি তাকে আদৌ কোনো মায়া নিয়ে হাত বাড়াবে?

আজ কবি হেলাল হাফিজের মৃত্যুদিন। তাঁর কবিতার দুটি পংক্তি দিয়েই লেখা শেষ করা যায়—
‘বেদনার সব কথা মানুষ বলে না।’
‘গিয়ে থাকলে আমার যাবে কার কী তাতে?’

যাবে কেবল এক সাধারণ মানুষের পরিবারের—হাদীর পরিবারের। দুঃখভার তাদেরই থাকবে।এই রাষ্ট্র আজও ঘৃণা থেকে ভালোবাসার পথে হাঁটতে শিখল না।

—  কবি ও সাংবাদিক আহসান কবির

All Categories