ক্রিকেটকে বিয়ে করেছি বটে, কিন্তু প্রথম প্রেম ফুটবল
ধোনির গলায় ভেসে আসা সেই গান—"ম্যায় পল দো পল..."—শুনলে মনে হয়, ফুটবল মাঠের ধুলোয় মিশে থাকা লক্ষ কবির শেষ চিঠি। একজন কবি কতক্ষণ বাঁচে? ঠিক যতক্ষণ একটি পাস সফল হয়, যতক্ষণ গোলের জালে বল আটকে থাকে। তারপর? তারপর তো শুধু হাইলাইটস রিপ্লেতে নিজেকে খুঁজে বেড়ানো।
পেলে, ম্যারাডোনা—নামগুলো এখন ইতিহাসের ফ্রিজে জমে থাকা বরফের টুকরো। একদিন গলে গেছে, নতুন নামে জমেছে বরফ। কিন্তু মেসির জার্সি যেদিন জাদুঘরে তুলে দেওয়া হবে, সেদিন কোনো শিশু জিজ্ঞাস করবে—"এই লোকটা কি সত্যিই পৃথিবী কাঁপাত?" সময়ের খেলাঘরে সবকিছুই তো এক বালকের স্বপ্নের মতো ক্ষণভঙ্গুর। যে বালক ভোরে মাছ ধরতে যায়, দুপুরে আম পাড়ে, রাতে ঘুমের মধ্যে হ্যাটট্রিক করে—সবই তো এক ফোঁটা শিশিরের আয়ু।
হামজা চৌধুরীর জুতোয় লেগে থাকা বাংলাদেশের মাটি কি এশিয়ান শ্রেষ্ঠত্বের টার্ফে গন্ধ ছড়াবে? না ছড়ালেও কি হবে! ওই তো বগুড়ার কোনো মাঠে দাঁড়িয়ে আছে আরেক হামজা—তার পায়ে জুতো নেই, হাতে পলিথিনের বল। সে প্রতিদিন ভাঙা ইটের গায়ে পেনাল্টি মার্ক আঁকে। তার স্বপ্নের ওজন মাপতে ফিফার র্যাংকিং ছোট হয়ে যায়। হয়তো খোদার ডায়েরিতে লেখা আছে—"এই শিশুর হৃদয়ে এশিয়ার চ্যাম্পিয়নের বীজ অঙ্কুরিত হচ্ছে।"
এরপর সেই দিনগুলো মনে আছে? যখন ফুটবল ছিল ঘরের আদুরে মেয়ে—তার জার্সি ধুয়ে রোদে শুকাতাম, গোল হলে চোখে জল আসত। তারপর এল ক্রিকেট নামের পালিত বোন। সে দখল করে নিল আমাদের আয়না, ভালোবাসা, ঘুমের আগের গল্প। এখন ফুটবল শুধু পুরনো অ্যালবামের ছবি—যাকে দেখলে হঠাৎ শ্বাস আটকে আসে। তবু জানালার ফাঁকে দেখি, ফুটবল এখনও মাঠে নামে—নিঃশব্দে, অভিমানে, ধানখেতের আইলে দাঁড়িয়ে থাকা সেই আমগাছের ডালপালা ঝরার আগে শেষ লড়াইয়ে।
বাংলাদেশের ফুটবল মানেই তো ইলিশ ভাজা রান্নার গন্ধের মতো নস্টালজিয়া।
ক্রিকেট দশ দেশের খেলা, ফুটবল সারা দুনিয়ার।ফিফার সদস্য দেশের সংখ্যা জাতিসংঘের থেকেও বেশি!বাংলাদেশ একসময় ফুটবলেই বাঁচত।আজ সেই জায়গাটা নিয়েছে ক্রিকেট।কিন্তু কি নিশ্চিতভাবে বলা যায়, আরেকদিন ক্রিকেটও সরে যাবে না?
একদিন বাঙালি কি আবার স্টেডিয়ামে চিৎকার করে বলবে না—"গোল!"?খেলা আসলে জীবনের মতো।ফরেস্ট গাম্পের সেই বিখ্যাত ডায়ালগটা মনে পড়ে—"লাইফ ইজ লাইক আ বক্স অফ চকলেটস, ইউ নেভার নো হোয়াট ইউ আর গোন্না গেট।"খেলাও ঠিক তাই।
যে জিতবে বলে মাঠে নামে, সে-ই কখনো হেরে যায়।যে একসময় শীর্ষে ছিল, সে হারিয়ে যায় ধুলোয়।নতুন কেউ উঠে আসে, নতুন কোনো নাম, নতুন কোনো ইতিহাস।
আমরা ক্রিকেটকে বিয়ে করেছি বটে, কিন্তু ফুটবল তো প্রথম চুরি করা চুমু। প্রথম চুমু কেউ ভোলে? না, সে শুধু পুরনো চিঠির মধ্যে লুকিয়ে থাকে। হয়তো একদিন বৃষ্টির রাতে, টিভিতে সাকিবের সেঞ্চুরি দেখতে দেখতে হঠাৎ চ্যানেল পাল্টে ফুটবল দেখব—আর চোখে ভাসবে সেই আমগাছ, কেরোসিনের বালতি, নিষিদ্ধ বিকেলের গল্প...
সময়ের একটা ইশারা লাগবে শুধু।একটা বিকেলের রোদ, একটা বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যা।তারপর?বাঙালি সব ছেড়ে-ছুড়ে দৌড়াবে তার প্রথম প্রেমের কাছে,ফুটবলের কাছে।
সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক মাহাদী হাসান।