ভোরে বিয়ের আনন্দ, বিকেলে বর-কনেসহ ঝরল ১৩ প্রাণ

খুলনার কয়রা উপজেলার নাকশা গ্রামের আবদুস সালাম মোড়লের বাড়ি গত বুধবার রাতভর উৎসবে ছিল মাতোয়ারা। বড় মেয়ে মারজিয়া আক্তার মিতুর বিয়ে উপলক্ষে আয়োজন চলেছে ভোর পর্যন্ত। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে বর সাব্বির হোসেন নববধূসহ আত্মীয়স্বজন নিয়ে রওনা হয়েছিলেন নিজ বাড়ির উদ্দেশে। কিন্তু মাঝপথে একটি সড়ক দুর্ঘটনা উৎসবের সেই যাত্রা ঢেকে দিল বিষাদের কালো ছায়ায়।

মোংলা উপজেলার শেওলাবুনিয়া গ্রামে সাব্বিরদের বাড়ি পৌঁছানোর আগেই খুলনা-মোংলা মহাসড়কের বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার বেলাই ব্রিজ এলাকায় দুর্ঘটনার শিকার হয় তাদের মাইক্রোবাসটি। দুর্ঘটনায় গাড়িতে থাকা ১৫ জনের মধ্যে বর-কনেসহ দুই পরিবারের ১৩ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে তিন শিশুও রয়েছে। 

নিহতরা হলেন– নববধূ মারজিয়া আক্তার মিতু, তাঁর ছোট বোন লামিয়া (৮), দাদি রাফেজা খাতুন, বর সাব্বির হোসেন, তাঁর বাবা মোংলা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক, নানি আনোয়ার খাতুন, বরের ভাবি পুতুল, বোন ঐশী, ভাইয়ের ছেলে শিশুসন্তান আলিফ, সামিউল, ইরাম এবং গাড়িচালক নাঈম শেখ (২৮)।

প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন জানান, মোংলা থেকে ছেড়ে আসা নৌবাহিনীর একটি বাস বেলাই ব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা মোংলাগামী মাইক্রোবাসটির সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে উভয় গাড়ির সামনের অংশ দুমড়েমুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই কয়েকজন নিহত হন। 

কাটাখালী হাইওয়ে থানার এসআই কে এম হাসানুজ্জামান জানান, নিহতদের সবাই মাইক্রোবাসের যাত্রী। গাড়িতে বরের পরিবারের ১১ জন, কনে পরিবারের তিনজন, চালকসহ ১৫ জন ছিলেন। এর মধ্যে বরের পরিবারের ৯ জন, কনের পরিবারের তিনজন, চালকসহ ১৩ জন নিহত হন। 


আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে প্রথমে রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সুকান্ত কুমার পাল বলেন, দুর্ঘটনায় নিহত চারজনের মরদেহ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রয়েছে। 

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক মেহেনাজ মোশাররফ বলেন, সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত হাসপাতালে ৯ জনের মরদেহ এসেছে। এর মধ্যে তিনজন শিশু, তিন নারী আর তিন পুরুষ। আরেকজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। তিনিও মারা গেছেন।

রাত ৮টার দিকে খুলনা মেডিকেল কলেজ মর্গে আসেন নিহত মিতুর বাবা আবদুস সালাম মোল্লা। বিয়ের লাল শাড়ি ও হাতে মেহেদি পরা মেয়ের লাশ দেখেই মূর্ছা যান তিনি। কিছু সময় পর জ্ঞান ফিরলেও তিনি কোনো কথা বলতে পারছিলেন না। দুই মেয়ে ও মাকে হারিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে কিছু সময় পরপর বুক ছাপড়াচ্ছিলেন তিনি। তাঁর কান্না দেখে চোখে জল ঝরেছে উপস্থিত সবার। 

 

All Categories