ভারতে হিন্দু-মুসলিম প্রেমের জেরে যুগলকে হত্যা

ভারতের উত্তর প্রদেশে আন্তধর্মীয় প্রেমের সম্পর্কের জেরে এক তরুণী ও এক যুবককে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে মোরাদাবাদ জেলার উমরি গ্রামে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯ বছর বয়সী কাজল ও ২৭ বছরের মোহাম্মদ আরমান হিন্দু–মুসলিম প্রেমের সম্পর্কে জড়িত ছিলেন। এই সম্পর্ককে ‘পরিবারের সম্মানের জন্য হুমকি’ মনে করে কাজলের আপন তিন ভাই তাদের হত্যা করেছেন—এমন অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশ এটিকে স্পষ্টভাবে অনর কিলিং হিসেবে দেখছে।

গত ২১ জানুয়ারি উমরি গ্রামের উপকণ্ঠে নদীর তীরবর্তী একটি এলাকা থেকে মাটিচাপা দেওয়া অবস্থায় কাজল ও আরমানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, ১৮ ও ১৯ জানুয়ারির মধ্যরাতে কাজলের বাড়িতেই কোদাল দিয়ে পিটিয়ে তাদের হত্যা করা হয়। পরে মরদেহ লুকাতে নিয়ে যাওয়া হয় গ্রামের বাইরে।

উত্তর প্রদেশ পুলিশের উপ-মহাপরিদর্শক মুনিরাজ জি বলেন, প্রাথমিক তদন্তে এটি অনর কিলিংয়ের ঘটনাই বলে মনে হচ্ছে। পরিবারের সম্মানের অজুহাতে মেয়ের পছন্দের সম্পর্ক মেনে নিতে না পেরে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।

পুলিশ জানায়, কাজলের ভাই রাজরাম, সতীশ ও রিঙ্কু সাইনির বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাদের গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

উমরি গ্রামটি দিল্লি থেকে প্রায় ১৮২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। প্রায় ৪০০ পরিবারের বসবাস এখানে, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে হিন্দু ও মুসলমানরা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে ছিলেন। গ্রামবাসীদের ভাষ্য, এর আগে কখনো ধর্মীয় বিরোধ বা এমন সহিংস ঘটনার নজির নেই।

গ্রামের বাসিন্দা মহীপাল সাইনি বলেন, এটাই আমাদের গ্রামে প্রথম আন্তধর্মীয় প্রেমের ঘটনা। পরিবার চাইলে গ্রাম্য সালিশ বা বয়োজ্যেষ্ঠদের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসা করা যেত।

কাজল স্থানীয় একটি বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। আরমান কয়েক মাস আগে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে স্থানীয় এক পাথর ভাঙার ঠিকাদারের সঙ্গে কাজ করছিলেন। তাদের সম্পর্কের কথা পরিবারের কেউ জানতেন না বলেই দাবি করা হয়েছে।

আরমানের বড় ভাই ফারমান আলী বলেন, নিখোঁজ হওয়ার পর বন্ধুর কাছ থেকেই জানতে পারি, প্রায় দুই মাস ধরে কাজলের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল।

পুলিশ আরও জানায়, হত্যাকাণ্ডের পর বিভ্রান্তি ছড়াতে কাজলের পরিবার একটি সাধারণ ডায়েরি করে এবং আরমানের বিরুদ্ধে অপহরণের অভিযোগ তোলে। তবে জিজ্ঞাসাবাদে অসংগতি ধরা পড়ায় তদন্তের সূত্র ধরে মরদেহ উদ্ধারের পথ খুলে যায়।

ঘটনার পর গ্রামে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে, যাতে কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়িয়ে না পড়ে। তবে পুরো গ্রামজুড়ে নেমে এসেছে চাপা আতঙ্ক আর নীরবতা।

ভারতে জাতীয় অপরাধ নথি ব্যুরোর তথ্যমতে, ২০১৪ সাল থেকে অনর কিলিংয়ের পরিসংখ্যান রাখা শুরু হয়। সর্বশেষ হিসাবে ২০২৩ সালে ৩৮টি অনর কিলিংয়ের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, বাস্তব সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি।

মানবাধিকারকর্মী কবিতা শ্রীবাস্তব বলেন, সমস্যার প্রকৃত মাত্রা স্বীকার না করলে সমাধানও সম্ভব নয়। সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন ছাড়া শুধু আইন দিয়ে অনর কিলিং বন্ধ করা যাবে না।

All Categories