ভালোবাসা না মানসিক ফাঁদ? সম্পর্কের আড়ালে লুকিয়ে থাকা নিয়ন্ত্রণের গল্প

প্রথমে মনে হবে এটাই প্রেম। যেন সিনেমার পর্দা থেকে উঠে আসা এক পরিপূর্ণ ভালোবাসা। দুজন মানুষের মধ্যে এমন টান, এক মুহূর্তও একে অপরকে ছাড়া থাকতে পারছেন না। মনে হবে, এটাই তো সম্পর্কের প্রকৃত রূপ নির্ভরতা, ভালোবাসা আর একসঙ্গে থাকা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্কের খোলস খুলে ধরা দেয় এক ভিন্ন চেহারা।

এই সম্পর্কেই একসময় দেখা যায়, একজন ব্যক্তি আর মানসিকভাবে স্বাধীন নন। নিজের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না, একা থাকতে পারেন না। সঙ্গীর উপস্থিতিতেই খুঁজে পান নিরাপত্তা, অথচ এই নির্ভরতাই পরিণত হয় এক অদৃশ্য ফাঁদে। সম্পর্ক হয়ে ওঠে দমবন্ধ করা, বিষাক্ত।

মনোবিদরা এই পরিস্থিতিকে বলেন ‘এনমেশমেন্ট’ যেখানে সম্পর্কের নির্ভরতা সীমা অতিক্রম করে ব্যক্তিত্বের ওপর হস্তক্ষেপে পৌঁছে যায়। ‘স্ট্রাকচারাল ফ্যামিলি থেরাপি’র প্রবর্তক সালভাদর মিনুচিন প্রথম এই ধারণার কথা বলেন।

মনোবিদ কী বলছেন?

কলকাতার মনোবিদ শ্রাবস্তী মজুমদার  বলেন, প্রথম প্রথম খুব ভাল লাগে। সব কী রকম সিনেমার মতো! নিরাপত্তাবোধ মনকে আরাম দেয়। এটা ভেবেই ভাল লাগে যে, কেউ আমার এত ভালবাসে! কিন্তু ধীরে ধীরে দমবন্ধকর হয়ে ওঠে সেই সম্পর্কই। যখন দেখা যায়, কেবলমাত্র নিজের বলে আর কিছু নেই, ব্যক্তিগত গণ্ডি বার বার মুছে দিচ্ছেন অন্য দিকের মানুষটি, বাইরের জগতের সঙ্গে মিশতেও দিচ্ছেন না, তখন বোঝা যায়, সবটা বদলে গিয়েছে। যেটাকে নিরাপত্তাবোধ হিসেবে দেখছিলেন, সেটা যে আগাগোড়া মিথ্যে, তা স্পষ্ট হয়ে যায়। তাই এটিকে অনেকেই ফাঁদ বলে চিহ্নিত করেন।

‘এনমেশমেন্ট’-এর লক্ষণ ?

অতিরিক্ত নির্ভরতা ,নিজস্ব মত বা স্বাধীনতা না থাকা,ব্যক্তিগত পরিসর মুছে যাওয়া,বাইরের জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া ,সম্পর্ক ছাড়াও কিছু ভাবতে না পারা ।

কীভাবে বেরিয়ে আসবেন এই ফাঁদ থেকে? মনোবিদের পরামর্শ অনুযায়ী, ধাপে ধাপে সচেতন হতে হবে:

১. প্রথমে বুঝতে হবে সম্পর্কটি নিজের মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে কি না।

২. এরপর স্বীকার করতে হবে যে সম্পর্কটি বিষাক্ত হয়ে উঠছে।

৩. সমস্যা কীভাবে তৈরি হচ্ছে, তা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে।

৪. সম্পর্ক চালিয়ে যেতে চাইলে, সঙ্গীর সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা জরুরি। নিজের পরিসর স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে। পারস্পরিক সম্মান ও সীমারেখা তৈরি করতে হবে।

৫. তবুও যদি সম্পর্কটি দমবন্ধকর হয়ে ওঠে, সেখান থেকে সরে আসাটাই হতে পারে সুস্থ পথ।

প্রেম যদি হয়ে দাঁড়ায় শ্বাসরুদ্ধকর, তবে তা আর প্রেম থাকে না রয়ে যায় কেবল মানসিক দাসত্ব। আত্মমর্যাদা ও মানসিক সুস্থতার কথা মাথায় রেখে প্রয়োজন হলে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়াই হতে পারে পরবর্তী শান্তির দিশা।

All Categories