স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী- উপদেষ্টা-প্রতিমন্ত্রীর যত বেফাঁস মন্তব্য
সব সরকারের সময় জনগণের সমালোচনার মুখে পড়তে দেখা যায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী বা উপদেষ্টা এবং প্রতিমন্ত্রীর। স্বাধীনতার পর থেকে যারাই এই চেয়ারে বসেছেন সমালোচনা তাদের পিছু ছাড়েনি। আবার বেফাস মন্তব্য করেও সমালোচিত হয়েছেন তারা। যেমন- ‘আল্লার মাল আল্লায় নিয়ে গেছে’, ‘উই আর লুকিং ফর শত্রুজ’, ‘দণ্ড ধরে নাড়াচাড়া করায় রানা প্লাজা ধসে পড়েছে’, ‘সন্ধ্যার পর থেকে পরিস্থিতি টের পাবেন’- এমন সব কথা তো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের কাছ থেকেই শুনেছে বাংলাদেশের মানুষ।
বাংলাদেশের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন এ এইচ এম কামারুজ্জামান। তারপর এরশাদ আমল পর্যন্ত ১১ জন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর চেয়ারে বসেছিলেন। তাদের মধ্যে এরশাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এম এ মতিন বিতর্কে পড়েছিলেন। তবে সামরিক শাসনামলে সংবাদমাধ্যমকে চাপের মধ্যে কাজ করতে হওয়ায় সরকারের কর্তাব্যক্তিরা বেফাঁস কথা বললেও তা নিয়ে লেখালেখির সুযোগ খুব একটা ছিল না।
১৯৯১ সালে দেশে গণতন্ত্র ফেরার পর থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের কথার দাপট বাড়তে থাকে। ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার সরকারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন এম এ মতিন। চিরকুমার এই ব্যক্তি পাঁচ বছরে দায়িত্ব পালনের সময় কথার চেয়ে অবশ্য নানা কাজের জন্য সমালোচিত ছিলেন।
১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা সরকার গঠনের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী করেন মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামকে। রাজনীতিতে নবিস রফিক তার নানা কথায় সরকারকে বিপাকে ফেলতে থাকেন।
১৯৯৭ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর তার উপস্থিতিতে পুলিশি হামলা হলে তিনি বিতর্কে পড়েন। তখন তিনি আবার বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছিলেন, পুলিশ কেন হামলা করল, তা তিনি বুঝতে পারছেন না।
রফিক ওই পদে বেশি দিন টিকতে পারেননি। তিন বছরের মাথায় তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। বাকি দুই বছর অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সামলান মোহাম্মদ নাসিম।
২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোটের সরকারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর চেয়ারটি বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান আলতাফ হোসেন চৌধুরীকে দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া।
কিন্তু তিনিও বেফাঁস মন্তব্য করে ফেঁসে যান। একটি শিশু তার বাবার কোলে থাকা অবস্থায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে প্রাণ হারালে সান্ত্বনা জানাতে গিয়ে মন্ত্রী আলতাফ বলেছিলেন- ‘আল্লার মাল আল্লা নিয়ে গেছে’।
মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী কথাটিতে ভুল কিছু না থাকলেও অসময়োচিত ওই উক্তির জন্য ঠাট্টা-বিদ্রুপসহ ব্যাপক সমালোচনায় পড়েন আলতাফ। আড়াই বছরের মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ছাড়তে হয় তাকে।
আলতাফের বিদায়ের পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চালাতে থাকেন তার ডেপুটি লুৎফুজ্জামান বাবর। জেল দেওয়া চুলে, রোদ চশমা আঁটা চোখে ক্যামেরার সামনে আসতেন বাবর। তবে কিছু দিনের মধ্যেই তার কথা-বার্তায় হারিয়ে যায় তার কেশচর্চা।
তার সবচেয়ে আলোচিত উক্তি ছিল- ‘উই আর লুকিং ফর শত্রুজ’। ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার পর তার সেই কথা আজও অনেকের মনে ভেসে ওঠে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী করা হয় সাহারা খাতুনকে। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তিনি। সাড়ে ৩ বছর রাখার পর এই পদ থেকে তাকে সরিয়ে দেন শেখ হাসিনা।
সাহারা খাতুন বড় সমালোচনায় পড়েছিলেন ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের পর। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেপ্তারের ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তা করতে না পারায় পড়েন তোপের মুখে, তার জেরে সেই বছরের অক্টোবরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ছাড়তে হয়েছিল তাকে।
সাহারা বিদায় নেওয়ার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয় মহীউদ্দীন খান আলমগীরকে। হার্ভার্ডের পিএইচডি ডিগ্রিধারী এই দুঁদে আমলাও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে পূর্বসূরিদের পথ ধরেন।
২০১৩ সালের এপ্রিলে রানা প্লাজা ধসে সহস্রাধিক শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা যখন বিশ্বজুড়ে আলোচিত, তখন মহীউদ্দীন খান আলমগীর এই ভবন ধসের জন্যও বিএনপিকে দায়ী করেন। তিনি বলেছিলেন, “কিছু হরতাল সমর্থক ভবনটির ফাটল ধরা দেয়ালের বিভিন্ন স্তম্ভ এবং গেট ধরে নাড়াচাড়া করেছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন। ভবনটি ধসে পড়ার পেছনে সেটাও একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে।”
তার সেই বক্তব্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এক বছরের খানিকটা বেশি সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে পেরেছিলেন মহীউদ্দীন আলমগীর।
২০১৪ সালে শেখ হাসিনা পুনরায় সরকার গঠনের পর স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী করেন আসাদুজ্জামান খান কামালকে। এক বছর পর তাকে প্রমোশন দিয়ে পূর্ণ মন্ত্রী করেন।
চাওয়ার চেয়ে বেশি পাওয়া কামাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে ছিলেন কিছুটা ব্যতিক্রম। কথা কম বলার কারণে তেমন কোনও বেফাঁস কথা তার মুখ দিয়ে বের হয়নি। ফলে ২০২৮ সালে ও ২০২৪ সালে সরকার গঠনের পর তাকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদেই রাখেন শেখ হাসিনা। গত বছর অভ্যুত্থানে সরকার পতনের আগ পর্যন্ত সেই পদেই ছিলেন তিনি।
অভ্যুত্থানের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তবর্তীকালীন সরকার গঠনের পর প্রথমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেনকে। কিন্তু পূর্বসূরিদের আছর লাগে তার ওপরও। ফলে মাত্র আট দিন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদে টিকতে পেরেছিলেন তিনি।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার দায়িত্ব পেয়েই অভ্যুত্থানে নিহত সবার দেহে পাওয়া গুলিগুলো পুলিশের নয় বলে সন্দেহ প্রকাশ করে বক্তব্য দেন তিনি। এরপর সীমান্তে বিজিবিকে বিএসএফের কাছে পিঠ না দেখাতে বলেন তিনি।
এই দুই বক্তব্য নিয়ে সমালোচনার মধ্যে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার সম্ভাবনার কথা বলে বিতর্কের ঝড় তোলেন তিনি। তা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হলে তাকে সেই দপ্তর থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
এরপর স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার দায়িত্ব দেওয়া হয় অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল জাহাঙ্গীর আলমকে। তিনিও নানা মন্তব্যে বিতর্ক তৈরি করে যাচ্ছেন।
'দিনে-রাতে কাজ করছেন' বোঝাতে গভীর রাতে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছিল বলে মন্তব্য করেছিলেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম। আর এনিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়।
‘সন্ধ্যার পর থেকে পরিস্থিতি টের পাবেন’ স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার এই বক্তব্য সবার মুখে মুখে।