শ্বেতপাথরের কলসিতে থাকবে পোপের হৃদপিণ্ড,আর ও অন্যান্য নিয়ম
বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীর আধ্যাত্মিক নেতা পোপ ফ্রান্সিসের মৃত্যু হলে শুরু হয় এক গাম্ভীর্যপূর্ণ ও সুপ্রাচীন আচার-অনুষ্ঠান। মৃত্যুর ঘোষণা থেকে শুরু করে শেষকৃত্য ও পরবর্তী পোপ নির্বাচনের প্রতিটি ধাপ চলে নির্দিষ্ট বিধি ও প্রথা মেনে।
পোপ ফ্রান্সিসের মরদেহ থেকে হৃদপিণ্ড অপসারণ করে তা শ্বেতপাথরের কলসাকৃতির পাত্রে সংরক্ষণ করা হবে। রোমের ত্রেভি ঝরনার কাছে অবস্থিত একটি গির্জায় এর আগের ২২ জন পোপের হৃদপিণ্ড রাখা আছে। খ্রিস্টানদের বিশ্বাস, এগুলো ‘পবিত্র দেহাবশেষ’।
মরদেহ সাধারণত শায়িত রাখা হয় সেন্ট পিটার্স বাসিলিকায়। গায়ে সুগন্ধী মাখানো থাকে সর্বক্ষণ। এই সময়েই অপারেশন করে কিছু অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সংরক্ষণের জন্য আলাদা করা হয়।
চিকিৎসকেরা যখন নিশ্চিত হন যে পোপের দেহে আর প্রাণচিহ্ন নেই নিঃশ্বাস নেই, হৃদযন্ত্র থেমে গেছে তখন শুরু হয় আনুষ্ঠানিকতা।
প্রথা অনুযায়ী, মৃত্যুর ঘোষণা দেন ক্যামেরলেঙ্গো। এই মুহূর্তে পদে রয়েছেন আইরিশ কার্ডিনাল কেভিন ফারেল। তিনি পোপকে তিনবার নাম ধরে ডাকেন। কোনো সাড়া না পেলে মৃত ঘোষণা করেন। এরপর কলেজ অফ কার্ডিনালকে তা জানান।
কলেজ অফ কার্ডিনাল হলো গির্জার শীর্ষ কর্মকর্তাদের একটি কমিটি, যাঁরা পোপ নির্বাচনের দায়িত্বে থাকেন। এই কমিটিকেই আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত্যুর খবর জানানো হয়, এরপর ভ্যাটিকান সংবাদমাধ্যমের সামনে তা ঘোষণা করে।
পোপের মৃত্যুর চার থেকে ছয়, কখনও কখনও নয় দিন পরে তার সমাধি দেওয়া হয়। সাধারণত এই দায়িত্বে থাকেন কলেজ অফ কার্ডিনালের ডিন।
অধিকাংশ পোপকে সমাধিস্থ করা হয় ভ্যাটিকান গ্রোতেস–এ, যা সেন্ট পিটার্স বাসিলিকার নিচে অবস্থিত। তবে পোপ ফ্রান্সিস আগেই জানিয়ে গেছেন, তিনি চান তাকে সমাধি দেওয়া হোক রোমের সান্তা মারিয়া ম্যাজিওরে বাসিলিকায়।
প্রাচীন রোমান রীতি অনুযায়ী, পোপের মৃত্যুর পর পালিত হয় নভেনদিয়ালে ৯ দিনের শোকানুষ্ঠান। এই সময় মরদেহ সবার শ্রদ্ধার জন্য শায়িত থাকে, পোপের পোশাক পরিহিত অবস্থায়। হাজার হাজার মানুষ ভ্যাটিকানে এসে শেষ শ্রদ্ধা জানান।
শেষকৃত্যের প্রায় তিন সপ্তাহ পর শুরু হয় নতুন পোপ নির্বাচনের কাজ।
সিস্টিন চ্যাপেল এ ডাকা হয় কনক্লেভ যেখানে অংশ নেন ৮০ বছরের কম বয়সী সক্রিয় কার্ডিনালরা। দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। ভোট শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেউ ঢুকতে বা বের হতে পারেন না।
ভোট শেষে ব্যালটপত্র স্টোভে পুড়িয়ে ফেলা হয়। এরপর রাসায়নিক পদ্ধতিতে একটি চিমনি দিয়ে ধোঁয়া নির্গত করা হয়যার রং দেখে জনগণ বুঝতে পারেন নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে কি না।
কালো ধোঁয়া: এখনো নতুন পোপ নির্বাচিত হয়নি। সাদা ধোঁয়া: নতুন পোপ নির্বাচিত।
কে হতে পারেন পরবর্তী পোপ?
পোপ ফ্রান্সিসের উত্তরসূরি কে হবেন, তা নিয়ে ইতিমধ্যে আলোচনায় উঠে এসেছে কয়েকটি নাম।
কার্ডিনাল পিয়েত্রো প্যারোলিন (৭০): ২০১৩ সাল থেকে ভ্যাটিকানের পররাষ্ট্র সচিব। প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে পারদর্শী।কার্ডিনাল পিটার এরদো (৭২): হাঙ্গেরির এই কার্ডিনাল ক্যাথলিকদের বিবাহবিচ্ছেদ ও পুনর্বিবাহে কঠোর অবস্থান গ্রহণের জন্য পরিচিত।কার্ডিনাল লুই অ্যান্তোনিও ট্যাগল: ফিলিপাইনের জনপ্রিয় ও জনদরদী এই কার্ডিনাল তরুণদের কাছে বিশেষভাবে গ্রহণযোগ্য।
আলোচনায় আছেন আরও দুই নাম: কার্ডিনাল ম্যাত্তেও জুপ্পি ও কার্ডিনাল রেমন্ড লিও বুর্ক।
পোপ ফ্রান্সিসের প্রয়াণ শুধু ক্যাথলিক জগত নয়, গোটা বিশ্বের কাছে এক শোকাবহ ক্ষণ। তবে সেই শোকের মধ্য দিয়েই শুরু হবে নতুন পথচলা। চোখ থাকবে সিস্টিন চ্যাপেল থেকে নির্গত ধোঁয়ার দিকে। সাদা ধোঁয়া উঠলেই জানা যাবে, কে হচ্ছেন নতুন পোপ।