স্বাস্থ্যগুণে ভরপুর পান্তা, নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে রক্তে শর্করার মাত্রা

পান্তাভাতের জল, তিন পুরুষের বল’ বাংলার লোককবিতায় জায়গা পাওয়া এই ঐতিহ্যবাহী খাবার এবার বৈজ্ঞানিক গবেষণাতেও প্রমাণ করল নিজের গুরুত্ব। যুক্তরাজ্যে পরিচালিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে, পান্তাভাত শুধু সহজপ্রাপ্য ও সাশ্রয়ী নয়, বরং এতে রয়েছে বিপুল পুষ্টিগুণ। বিশেষ করে অণুজীব ও অণুপুষ্টি উপাদানে সমৃদ্ধ এই খাবার রক্তে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলেও জানিয়েছেন গবেষকরা।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত এই গবেষণাটি ছাপা হয় যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ফুড অ্যান্ড হিউম্যানিটি–তে। গবেষণার নেতৃত্ব দেন লিভারপুল জন মুরস ইউনিভার্সিটি-এর স্কুল অব ফার্মাসি অ্যান্ড বায়োমলিকুলার সায়েন্সেসের অধ্যাপক মোশাররফ হোসেন সরকার। তার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও আটজন গবেষক।

অধ্যাপক মোশাররফ জানান আমাদের গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল খরচে সাশ্রয়ী এবং সহজলভ্য এই খাবারটি অপুষ্টির বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর হতে পারে, তা যাচাই করা। আমরা পান্তার অণুজৈবিক গঠন, পুষ্টিমান এবং রক্তে শর্করার ওপর এর প্রভাব বিশ্লেষণ করেছি।

গবেষণায় যুক্তরাজ্যের মিডলসব্রো শহরের একটি বাঙালি পরিবারে থাকা ১৩ জন সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। রান্না করা সাদা বাসমতী চালে পানি দিয়ে রেখে ১২ ঘণ্টা গাজনপ্রক্রিয়ায় তৈরি করা হয় পান্তাভাত দুটি ভিন্ন তাপমাত্রায়: ২০ ও ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পরবর্তীতে এই খাবার গ্রহণের পর অংশগ্রহণকারীদের রক্তে শর্করার মাত্রা মাপা হয়।

গবেষণায় দেখা যায় সাধারণ ভাতের তুলনায় পান্তাভাতে ১০ গুণ বেশি প্রোবায়োটিক (উপকারী ব্যাকটেরিয়া) জন্মায়।

পান্তা খাওয়ার পর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ধীরে বাড়ে, যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য সহায়ক হতে পারে।

এতে পাওয়া গেছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে লৌহ, ক্যালসিয়াম, জিংক, কপার, ম্যাগনেশিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, বোরন ও পটাশিয়াম।

উদাহরণস্বরূপ, প্রতি আড়াই গ্রাম রান্না করা ভাতে যেখানে লৌহ থাকে ০.৫ মাইক্রোগ্রাম, সেখানে পান্তাভাতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ মাইক্রোগ্রাম। ক্যালসিয়ামেও রয়েছে চারগুণ বৃদ্ধি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক খালেদা ইসলাম বলেন,এই গবেষণার মধ্যে অভিনবত্ব রয়েছে। আরও বিস্তৃত পরিসরে এটি করা হলে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী খাবার পান্তার গুণাগুণ বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা সম্ভব হবে।

অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মিহির লাল সাহা বলেন,রান্না করা ভাতে থাকা আঁশ সহজে শরীর গ্রহণ করতে পারে না, কিন্তু গাজনের মাধ্যমে তা দ্রবীভূত হয়ে যায়। ফলে পান্তায় অণুপুষ্টির ঘনত্ব অনেক বেড়ে যায়।

একসময় গরিবের খাবার হিসেবে পরিচিত পান্তাভাত আজ বৈজ্ঞানিক গবেষণায় উঠে এসেছে একটি সম্ভাবনাময় পুষ্টির উৎস হিসেবে। সহজপ্রস্তুত, কম খরচে তৈরি এবং পুষ্টিকর উপাদানে সমৃদ্ধ এই খাবারটি ভবিষ্যতে খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের একটি অংশ হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার মতো উন্নয়নশীল অঞ্চলে, যেখানে অপুষ্টি এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ—সেখানে পান্তাভাত হতে পারে একটি কার্যকর, বাস্তবসম্মত ও ঐতিহ্যনির্ভর সমাধান।

All Categories