সরকারি চাকরির ‘কঠোর’ অধ্যাদেশ বাতিলের দাবিতে উত্তাল সচিবালয়

‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে টানা তৃতীয় দিনের মতো বিক্ষোভ করেছেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। সোমবার সকাল ১১টার দিকে রাজধানীর সচিবালয়ের বাদামতলায় হাজারো কর্মচারী জমায়েত হন। বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদের ব্যানারে এ কর্মসূচি পালিত হয়।

এর আগে, গত শনিবার ও রোববারও সচিবালয়ের অভ্যন্তরে কর্মচারীরা বিক্ষোভ ও মিছিল করেন। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, নতুন অধ্যাদেশটি সরকারি চাকরিজীবীদের অধিকার খর্ব করে এবং এটি সংবিধানবিরোধী ও স্বৈরতান্ত্রিক।

কি রয়েছে নতুন অধ্যাদেশে?

গত ২৩ মে (বৃহস্পতিবার) অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে ‘সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮’ সংশোধনের মাধ্যমে ‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়। পরদিন তা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়।

নতুন অধ্যাদেশে সরকারি চাকরিজীবীদের চারটি কাজকে “অসদাচরণ” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেগুলো হলো:

এমন কোনো কাজে লিপ্ত হওয়া যা অন্যদের মধ্যে অনানুগত্য তৈরি করে বা শৃঙ্খলা বিঘ্ন করে। ছুটি ছাড়া বা যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া এককভাবে বা দলগতভাবে দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকা। অন্য কোনো কর্মচারীকে দায়িত্ব পালনে বিরত থাকতে উসকানি বা প্ররোচনা দেওয়া। অন্য কর্মচারীর দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া।

উল্লিখিত অপরাধের জন্য দণ্ড হিসেবে রাখা হয়েছে— নিম্নপদে অবনমন, নিম্ন বেতন গ্রেডে স্থানান্তর, চাকরি থেকে অপসারণ, চাকরি থেকে বরখাস্ত করা।

অভিযোগ উঠলে ৭ দিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিতে হবে। দোষী প্রমাণিত হলে আরও ৭ কর্মদিবসের মধ্যে শাস্তির আদেশ দেওয়া যাবে। দণ্ডপ্রাপ্ত কর্মচারী ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে আপিল করতে পারবেন। তবে রাষ্ট্রপতির দেওয়া আদেশের বিরুদ্ধে কোনো আপিল করা যাবে না, শুধু পুনর্বিবেচনার আবেদন করা যাবে।

বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করছেন, অধ্যাদেশটি প্রণয়নের মাধ্যমে স্বাধীন মতপ্রকাশ, সংগঠন গঠন এবং যৌক্তিক আন্দোলনের অধিকার হরণ করা হয়েছে। এতে কর্মচারীদের ন্যায্য দাবি আদায়ের পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে।

বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদের সভাপতি মো. বাদিউল কবীর বলেন,"এই অধ্যাদেশ একটি কালাকানুন। এটি নাগরিক অধিকার ও সংবিধানপরিপন্থী। আমরা দাবি জানাচ্ছি, অবিলম্বে এটি প্রত্যাহার করতে হবে। না হলে আমাদের আন্দোলন আরও কঠোর হবে।"

তিনি আরও বলেন, “সরকার প্রায় পাঁচ দশক আগের কিছু নিষেধাত্মক ধারা পুনরায় যুক্ত করে বর্তমান কর্মপরিবেশে অস্থিরতা তৈরি করছে।”

দেশে বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। নতুন অধ্যাদেশ কার্যকর হলে সবার ওপর এর প্রভাব পড়বে। কর্মচারীদের দাবি, সরকার কোনো আলোচনায় না গিয়ে একতরফাভাবে এ ধরনের একটি অধ্যাদেশ জারি করেছে, যা গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থী।

সচিবালয় ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হলেও কর্মচারীদের প্রতিবাদ কর্মসূচি ব্যাহত হয়নি। আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন।

‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। প্রশাসনিক স্থবিরতা এড়াতে সরকারকে দ্রুত সংলাপে বসার দাবি জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট মহল। আন্দোলনকারীরা বলছেন, এই আইন বাতিল না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন।

All Categories