সন্তান জন্মদানের হার কমছে বিশ্বজুড়ে, জাতিসংঘের উদ্বেগ

বিশ্বব্যাপী এক নতুন জনসংখ্যা সংকটের দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) । সম্প্রতি প্রকাশিত এক জরিপে সংস্থাটি জানিয়েছে, অর্থনৈতিক সংকট, স্বাস্থ্যগত অনিশ্চয়তা, উপযুক্ত সঙ্গীর অভাব এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে শত কোটি মানুষ তাদের কাঙ্ক্ষিত সন্তানের সংখ্যা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছেন।

জাতিসংঘের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো জন্মহারের পতনকে কেন্দ্র করে ইউএনএফপিএ জোরালো অবস্থান নিয়েছে। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, ইতালি, হাঙ্গেরি, জার্মানি, সুইডেন, ব্রাজিল, মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মরক্কো, দক্ষিণ আফ্রিকা ও নাইজেরিয়া—এই ১৪টি দেশে ১৪ হাজার মানুষের ওপর জরিপ চালানো হয়। এসব দেশ বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশকে প্রতিনিধিত্ব করে।

জরিপে অংশ নেওয়া ৫০ বছরের বেশি বয়সী উত্তরদাতাদের ৩১ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা যত সন্তান চেয়েছিলেন তা নিতে পারেননি। ইউএনএফপিএ প্রধান ড. নাটালিয়া কানেম বলেন, “বিশ্বজুড়ে জন্মহার নজিরবিহীনভাবে কমছে। অধিকাংশ মানুষ দুই বা ততোধিক সন্তান চান, কিন্তু বাস্তবে তা সম্ভব হচ্ছে না। সেটাই এখন সবচেয়ে বড় জনসংখ্যা-সংক্রান্ত সংকট।”

জরিপে দেখা গেছে, ৩৯ শতাংশ মানুষ অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে সন্তান নিতে পারছেন না। দক্ষিণ কোরিয়ায় এই হার সর্বোচ্চ—৫৮ শতাংশ। আর সুইডেনে এই হার সবচেয়ে কম—১৯ শতাংশ।
অন্যদিকে, মাত্র ১২ শতাংশ মানুষ গর্ভধারণে শারীরিক জটিলতাকে মূল বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

হংকং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির জনসংখ্যা বিশ্লেষক অধ্যাপক স্টুয়ার্ট গাইটেল-বাস্টেন বলেন, “জাতিসংঘ এতদিন অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ এবং গর্ভনিরোধক পদ্ধতির অভাব নিয়েই কাজ করেছে। এবারই প্রথম তারা কম জন্মহার নিয়ে সরব হলো।”
 

ইউএনএফপিএ জানিয়েছে, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি সময়ের অভাবও বড় একটি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতের মুম্বাইয়ে বসবাসকারী কর্মজীবী নারী নম্রতার অভিজ্ঞতা এই বাস্তবতা ফুটিয়ে তোলে। প্রতিদিন অফিস যাতায়াতে তার তিন ঘণ্টা চলে যায়। বাড়ি ফিরে ক্লান্ত হলেও মেয়ের সঙ্গে সময় কাটাতে চান তিনি।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, জন্মহারের পতনের অজুহাতে অনেক দেশ জাতীয়তাবাদী, অভিবাসনবিরোধী বা রক্ষণশীল লিঙ্গনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ছে। অধ্যাপক স্টুয়ার্ট বলেন, “জন্মহার কমে যাওয়া, বয়স্ক জনগোষ্ঠী বৃদ্ধি বা জনসংখ্যা স্থবিরতাকে অনেক সরকার রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে, যা ভবিষ্যতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।”

ড. কানেম বলেন, “একসময় যেসব দেশে জন্মহার বেশি ছিল, যেমন চীন, কোরিয়া, জাপান, থাইল্যান্ড, সেগুলোই এখন জন্মহার বাড়ানোর মরিয়া চেষ্টা করছে। কিন্তু বিষয়টি এতটাই স্পর্শকাতর যে, এটিকে রাজনৈতিক প্রচারণা না বানিয়ে মানবিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে।”
ইউএনএফপিএ জানিয়েছে, এই জরিপটি মূলত একটি প্রাথমিক ধাপ। ভবিষ্যতে এটি ৫০টির বেশি দেশে বিস্তৃতভাবে পরিচালিত হবে বলে জানানো হয়েছে।

All Categories