সনদ মেনে দায়মুক্তি দেবে সরকার
জুলাই জাতীয় সনদের অঙ্গীকারনামা মেনে চলবে বিএনপি সরকার। গণঅভ্যুত্থানে তৎকালীন সরকারের চালানো হত্যাযজ্ঞ প্রতিরোধে ছাত্র-জনতার কৃতকর্মের বিচার হবে না। পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কেউ প্রতিরোধে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকলেও অভ্যুত্থানকারীদের জন্য দায়মুক্তি অব্যাহত থাকবে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ের একাধিক সূত্র সমকালকে জানিয়েছে, জুলাই সনদের অঙ্গীকারনামায় অন্য সব দলের মতো বিএনপিও সই করায় সরকার অভ্যুত্থানকারীদের দায়মুক্তি নিশ্চিত করবে। সূত্রগুলো জানায়, অভ্যুত্থানকারীদের আইনি দায়মুক্তিতে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ’ সংসদে আলোচনার পর অনুমোদন করা হবে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনোবল ধরে রাখা এবং সরকারের প্রতি আনুগত্য নিশ্চিত করতে পুলিশ হত্যার বিচার না করার প্রকাশ্য ঘোষণাও দেওয়া হবে না।
সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদে দেওয়া দায়মুক্তির ক্ষমতার অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, অভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার প্রতিরোধে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকলে আদালতে নয়, মানবাধিকার কমিশনে যেতে পারবেন। তদন্তে যদি প্রাথমিকভাবে প্রমাণ হয়, প্রতিরোধ নয়; অপরাধমূলক কাজের মাধ্যমে সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান বা বাহিনীর সদস্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তবে আদালতে বিচার হবে। প্রতিরোধে ক্ষতিগ্রস্ত হলে পরিবার ক্ষতিপূরণ পাবে।
এই অধ্যাদেশ বলবৎ থাকলেও সম্প্রতি কয়েকটি খবরে বলা হয়, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের স্থাপনায় হামলা ও হত্যার বিচারে তদন্তের জন্য ‘সবুজ সংকেত’ দিয়েছে সরকার। তবে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সূত্র সমকালকে জানিয়েছে, এমন কোনো সংকেত দেওয়া হয়নি।
গত শুক্রবার স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গণঅভ্যুত্থানে পুলিশ হত্যার তদন্তের বিষয়ে বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেটি বলেছেন, সেটিই হবে। তদন্ত হয়েছে, প্রয়োজন হলে আবারও তদন্ত হবে। বিষয়গুলো যেহেতু আদালতে আছে, আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চলবে।
গত শনিবার বিএনপির মহাসচিব নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লেখেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানে পুলিশ হত্যার তদন্তের বিষয় নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেটি বলেছেন, সেটিই হবে এবং দ্রুত তদন্ত করা হবে।’ এ বক্তব্যের ব্যাখ্যা কী, তা মির্জা ফখরুলের কাছ থেকে জানতে পারেনি সমকাল। যদিও জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি এই বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেছে, পুলিশ হত্যার তদন্তের নামে সরকার অভ্যুত্থানকে ভিন্নপথে ঠেলে দিতে চাইছে। জুলাই সনদে দেওয়া আইনি সুরক্ষার অঙ্গীকার লঙ্ঘন করছে। মীমাংসিত বিষয়কে বিতর্কিত করছে।
কী বলেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ দায়িত্ব নেওয়ার পর জুলাই অভ্যুত্থানে পুলিশ হত্যার তদন্তের বিষয়ে কখনও কিছু বলেননি। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি তিনি সচিবালয়ে বলেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর যেসব মামলা হয়েছে, সেগুলো পুনরায় যাচাই-বাছাই করতে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিরীহ মানুষ যাতে ভোগান্তির শিকার না হন, সে জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমেদ সমকালকে বলেন, ৫ আগস্টের কিছু মামলায় গণহারে আসামি করে নিরপরাধ মানুষকে কষ্ট দেওয়ার বিষয় সামনে এসেছে। আইনের শাসন সমুন্নত রাখতে এসব মামলা যাচাই করে নিরাপদ ব্যক্তিদের অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সরকারি গেজেট অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী লীগের হামলায় ৮৩৪ অভ্যুত্থানকারী শহীদ হয়েছেন। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের ৪৩ সদস্য নিহত হন। আহত আরেকজনের মৃত্যু হয় একই বছরের ১৪ আগস্ট। ৫ আগস্ট ভোররাত পর্যন্ত পুলিশের ৪৬০টি থানায় হামলা হয়।
৪৪ পুলিশ নিহত, গুজবে বেশি
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ও পুলিশ সদরদপ্তর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে একাধিকবার নাম-ঠিকানাসহ অভ্যুত্থানে নিহত ৪৪ পুলিশ সদস্যের পরিচয় প্রকাশ করে। যদিও অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগসহ অনেকের দাবি সংখ্যাটি হাজার হাজার। যদিও কখনও তারা কারও নাম-পরিচয় দিতে পারেনি।
এরই মধ্যে ৪২ পরিবারকে সরকার আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। উত্তরাধিকার জটিলতার কারণে দুই পরিবারের আর্থিক সহায়তা আটকে আছে।
গণঅভ্যুত্থানে ভারতে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানসহ অনেকেই দাবি করেন, চব্বিশের ৪ আগস্ট সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় ছাত্র-জনতার হামলায় নিহত ১৫ পুলিশ সদস্যের মধ্যে পৃথিবী চাকমা নামে অন্তঃসত্ত্বা এক নারী কনস্টেবলও ছিলেন। পরে পৃথিবী চাকমা ভিডিওবার্তার মাধ্যমে জানান, তিনি বেঁচে আছেন। চব্বিশে সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরে তাঁর পোস্টিং ছিল না। তিনি সে সময়ে অন্তঃসত্ত্বাও ছিলেন না।
শেখ হাসিনা একাধিকবার দাবি করেন, অভ্যুত্থানে পুলিশের তিন হাজার ৩৩২ জন নিহত হয়েছেন। তবে আওয়ামী লীগ ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে যে তথ্যচিত্র প্রকাশ করে, তাতে নিহত পুলিশের সংখ্যা ৪৪, যা সরকারি হিসাবের সমান।
কী করতে যাচ্ছে সরকার
গত বছরের ১৭ অক্টোবর রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই জাতীয় সনদে সই করে। এতে সাত দফা অঙ্গীকারনামা রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই অভ্যুত্থানকারীদের আইনি সুরক্ষা দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে।
পঞ্চম দফায় বলা হয়েছে, জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় সদস্যের ঘটানো সব হত্যার বিচার হবে। শহীদদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, আহতদের বীর হিসেবে স্বীকৃতি ও পুনর্বাসন দেওয়া হবে। জুলাইযোদ্ধাদের আইনি দায়মুক্তি, মৌলিক অধিকার সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
দায়মুক্তি নিশ্চিত করতে গত ১৭ অক্টোবর সংসদ ভবন এলাকায় বিক্ষোভ করেন জুলাইযোদ্ধারা। ওই সময়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ অঙ্গীকারনামায় জুলাইযোদ্ধাদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিতে প্রস্তাব করে বলেছিলেন, গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্ট বাহিনী ও তাদের অনুগত কিছু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য নিরীহ-নিরস্ত্র আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ওপর হানাদার বাহিনীর মতো নির্বিচারে গণহত্যা চালায়।
বিএনপি স্বাক্ষরকারী অন্যান্য দলের জুলাই সনদের এই অঙ্গীকারেই স্থির রয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি সমকালকে বলেন, সবাই সনদের যে অঙ্গীকারনামায় সই করেছে, তা সবাইকে মেনে চলতে হবে।
সুরক্ষা অধ্যাদেশে কী আছে
অধ্যাদেশের ৪ ও ৫ ধারায় অভ্যুত্থানকারীদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। ৪ ধারায় বলা হয়েছে, অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়ার কারণে কারও বিরুদ্ধে মামলা হলে তা প্রত্যাহার হবে। তবে সরকার প্রত্যয়ন করবে, মামলাটি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণের কারণে দায়ের করা হয়েছিল কিনা। তেমন হলে মামলা চলমান থাকলেও অভিযুক্ত ব্যক্তি খালাসপ্রাপ্ত বলে গণ্য হবেন।
৫ ধারায় বলা হয়েছে, এই দায়মুক্তি থাকার পরও কোনো অভ্যুত্থানকারীর বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ থাকলে তা মানবাধিকার কমিশনে মামলা করা যাবে। কমিশন হত্যার শিকার ব্যক্তি যে প্রতিষ্ঠান বা বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন, তাতে বর্তমানে বা অতীতে কর্মরত ছিলেন, এমন কর্মকর্তা বাদে অন্য কাউকে দিয়ে তদন্ত করাবে। তদন্ত কমিশনের অনুমোদনে প্রয়োজনে আসামিকে গ্রেপ্তার করা যাবে। যদিও তদন্তে প্রমাণ হয়, অভ্যুত্থানের সময়ের অপরাধ বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির অপব্যবহার ছিল, তাহলে আদালতে বিচার হবে। আর প্রতিরোধের কারণে হয়ে থাকলে কমিশন উপযুক্ত মনে করলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে সরকারকে আদেশ দিতে পারবে। তবে আদালতে মামলা করা যাবে না।
জারির সময়ে সুরক্ষা অধ্যাদেশের বিরোধিতা করেনি বিএনপি। দলটির সূত্র জানায়, এতে তাদের সম্মতি ছিল। তবে সালাহউদ্দিন আহমেদ সমকালকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অন্যান্য অধ্যাদেশের মতো সুরক্ষা অধ্যাদেশও সংসদে উত্থাপনের পর আলোচনা মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হবে।
বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের সমকালকে বলেন, অভ্যুত্থানকারীদের আইনি সুরক্ষার লঙ্ঘনের কথা আসাই তো দুঃখজনক। তারা জাতিকে ফ্যাসিবাদমুক্ত করেছে। সনদ ও অধ্যাদেশে যেভাবে রয়েছে, সেভাবেই সুরক্ষা দিতে হবে।