শেয়ারবাজারে করোনা মহামারির পর সর্বোচ্চ পতন

এক প্রকার ধস নেমেছে দেশের শেয়ারবাজারে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের খবরে গত সপ্তাহের দর পতনে শেয়ারবাজার সূচক হারিয়েছিল ৩৫৯ পয়েন্ট বা ৬ দশমিক ৪২ শতাংশ। গতকাল রোববার সূচকটি আরও প্রায় ২৩২ পয়েন্ট বা ৪ দশমিক ৪২ শতাংশ হারিয়েছে। এ নিয়ে এই সময়ে সূচকের পতন হয়েছে ৫৯১ পয়েন্ট বা ১০ দশমিক ৫৬ শতাংশ।

গতকালের এ দর পতন ২০২০ সালের মার্চে করোনাভাইরাস মহামারি শুরুর পর সর্বোচ্চ। আর ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে ডিএসইএক্স চালুর পর সূচকের এ পতন চতুর্থ সর্বোচ্চ। শুধু ব্যাংক খাতের ৩১ কোম্পানির দর পতনে সূচক হারিয়েছে ১০৮ পয়েন্ট।

বড় দর পতন সত্ত্বেও সরকার বা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি পুরোপুরি নিশ্চুপ। গতকাল দর পতনের পর অনুষ্ঠিত শেয়ারবাজারবিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন সিএমজেএফের এক সেমিনারে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখলেও শেয়ারবাজারের দর পতন নিয়ে কোনো কথা বলেননি। একই অনুষ্ঠানে বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তিনিও চলমান পতন নিয়ে একটি কথাও বলেননি।

গতকাল ঢাকার শেয়ারবাজারে কেনাবেচা হওয়া ৩৫০ কোম্পানির শেয়ারের মধ্যে ৩৩৯টিই দর হারিয়েছে। বাকি ১১ শেয়ারের মধ্যে ১০টির দর বেড়েছে, অপরিবর্তিত থেকেছে একটির দর। তালিকাভুক্ত ৩৭ মিউচুয়াল ফান্ডের একটিরও দর বাড়েনি, কমেছে ২৫টির। শুধু গতকালের দর পতনে ঢাকার শেয়ারবাজারের ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ধারণ করা শেয়ারের মূল্য কমেছে ছয় হাজার ৩৬৯ কোটি টাকা। আর ইরান যুদ্ধের পর এখন পর্যন্ত কমেছে ১৫ হাজার ৮৯২ কোটি টাকা।

তবে এ অবস্থার মধ্যেও তুলনামূলক কমসংখ্যক শেয়ার ক্রেতাশূন্য হয়েছে। ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ৩৫০ কোম্পানির শেয়ারের মধ্যে লেনদেনের মাঝে ৪২ কোম্পানির শেয়ার সার্কিট ব্রেকারের সর্বনিম্ন দরে কেনাবেচা হলেও শেষ পর্যন্ত ওই দরে স্থির ছিল ২২টি, যার সবই রুগ্‌ণ, বন্ধ বা লোকসানি কোম্পানি। গত কিছু দিনে এসব শেয়ারের দর বেশ বেড়েছিল।

চলতি এই পতনের কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছেন না বলে জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আল আমীন। তিনি বলেন, এটা ব্যাখ্যাহীন দর পতন। ইরান যুদ্ধ শুরুর পরদিনের দর পতনকে যুদ্ধের কারণে বলে মনে করেছে অনেকে। তাহলে এর পরের দিন কেন শেয়ারদর বেড়েছিল। তিনি বলেন, সন্দেহ হচ্ছে, ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে পতন শুরু হলেও নেপথ্যে থেকে কেউ এটাকে উস্কে দিচ্ছে কিনা। 

ড. আল আমীনের সন্দেহ, বিএসইসির নেতৃত্বে পরিবর্তন আনতে কেউ উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাজারকে নিম্নমুখী করছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা দরকার। বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করার সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অনেক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী বর্তমানে নিষ্ক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ তার। বাজারের এই ভয়াবহ অবস্থায় সরকার বা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির পক্ষ আশ্বস্ত করে বক্তব্য আসা উচিত ছিল বলে মত দেন তিনি।

প্রাইম ব্যাংক সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান মনে করেন– ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যে জ্বালানি সংকট তৈরির শঙ্কা তৈরি হয়েছে, তাতে সামষ্টিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে– এমন ধারণায় চিন্তিত তারা। এর কারণে ‘আরও দর পতনের ভয়ে আগে শেয়ার বিক্রি করি’– এমন ধারণার বশবর্তী হয়ে অনেকে  শেয়ার বিক্রি করছেন।

মনিরুজ্জামান বলেন, পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন দেখে এবং গণমাধ্যমে জ্বালানি রিজার্ভের তথ্য সম্পর্কিত খবর দেখে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মনে সিদ্ধান্তহীনতা ও ভীতি তৈরি করছে, যা বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তিনি বলেন, বাজারে যখন বড় পতন হয়, তখন ক্রেতার সংখ্যা খুবই কমে যায়। ফলে ‘প্যানিক সেলাররা’ শেয়ার বিক্রির যে চাপ তৈরি করছে, তা বাজার সামাল দিতে পারছে না। ফলে সূচকের বড় পতন ঘটছে।

বিশ্বের অন্যান্য বাজারে শেয়ারের দাম কমলে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কেনার জন্য এগিয়ে আসে, কিন্তু বাংলাদেশে সেই সংস্কৃতি এখনও গড়ে ওঠেনি উল্লেখ করে  মনিরুজ্জামান বলেন, আমাদের দেশে এমন দক্ষ ফান্ড ম্যানেজার বা বিশেষজ্ঞের অভাব রয়েছে, যারা শেয়ারের অন্তর্নিহিত মূল্য বুঝে প্রতিকূল সময়ে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা মনে করেন দাম আরও পড়বে, তাই তারা অপেক্ষা করেন। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের এই সময়ে সক্রিয় হওয়া উচিত ছিল, যা হচ্ছে না।

তাঁর মতে, সরকারের দায়িত্বশীলদের উচিত বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নিয়ে পরিষ্কার বক্তব্য আসা, যাতে বিনিয়োগকারীদের মনের অহেতুক আতঙ্ক দূর হয় এবং আস্থা ফিরে আসে।

All Categories