শান্তির পর্ষদে অংশগ্রহণের দৌড়ে কারা এগিয়ে, কারা পিছিয়ে
আল জাজিরাঃ বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় নতুন এক উদ্যোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর নেতৃত্বে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি পর্ষদ। সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ৫৬তম বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ফাঁকে বৃহস্পতিবার এই পর্ষদের সনদে সই করেন ট্রাম্প। একই সঙ্গে সই করেন আরও ১৯ দেশের নেতা। পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব নিয়েছেন ট্রাম্প নিজেই।
শুরুতে গাজা সংকটে যুদ্ধবিরতি কার্যকর ও স্থায়ী করার লক্ষ্য নিয়ে এই উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরে এর পরিধি বাড়ানোর ঘোষণা দেন ট্রাম্প। তাঁর ভাষায়, ভবিষ্যতে সব ধরনের বৈশ্বিক সংঘাত সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারে এই বোর্ড। নিজেকে বৈশ্বিক শান্তির দূত হিসেবে তুলে ধরে ট্রাম্প বলেন, এই পর্ষদ একসময় বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী সংস্থাগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে। একই অনুষ্ঠানে জাতিসংঘের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সংস্থাটি তা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি।
তবে সনদ সইয়ের মঞ্চে এসে কিছুটা সুর পাল্টান ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘বোর্ড অব পিস’ জাতিসংঘের বিকল্প নয়; বরং জাতিসংঘের সঙ্গে সমন্বয় করেই কাজ করবে। তবুও আন্তর্জাতিক মহলে সন্দেহ কাটেনি। অনেক দেশ মনে করছে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে জাতিসংঘের কেন্দ্রীয় ভূমিকাই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের সঙ্গে মঞ্চে ছিলেন ১৯ দেশের প্রতিনিধি। এর মধ্যে তাঁর ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান ও আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলে ছিলেন সবচেয়ে আলোচিত মুখ। তুরস্ক, মিসর, সৌদি আরব ও কাতারের মতো মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশ এবং ইন্দোনেশিয়ার মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশও এই পর্ষদে যোগ দিয়েছে। এ নিয়ে ট্রাম্প রসিকতা করে বলেন, অংশগ্রহণকারীদের বেশিরভাগই জনপ্রিয় নেতা, আবার কেউ কেউ ততটা জনপ্রিয় নন—জীবন এমনই।
শান্তি পর্ষদের মোট সদস্য সংখ্যা এখনও চূড়ান্ত নয়। ট্রাম্পের ধারণা, ভবিষ্যতে প্রায় ৫০টি দেশ এতে যুক্ত হতে পারে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, আরও অন্তত ৩৫টি দেশ যোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যদিও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তাদের উপস্থিতি দেখা যায়নি।
এই পর্ষদে যোগ দেওয়া নিয়ে অনীহা দেখিয়েছে পশ্চিমা বিশ্বের বড় একটি অংশ। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্যের কেউ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এতে যোগ দেয়নি। ফ্রান্স স্পষ্টভাবে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, যুক্তরাজ্য বলেছে আপাতত তারা এই উদ্যোগে যুক্ত হচ্ছে না। চীনও এখনো তাদের অবস্থান জানায়নি।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেখা যায়নি। মিসর জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেও তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না। সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে রাশিয়া প্রসঙ্গে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন পর্ষদে যোগ দিতে সম্মত হয়েছেন। তবে পুতিন জানিয়েছেন, তিনি আমন্ত্রণটি এখনও পর্যালোচনা করছেন। এদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, পুতিনের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়টি তিনি কল্পনাও করতে পারেন না।
বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে পর্ষদের আর্থিক কাঠামো নিয়ে। স্থায়ী সদস্য হতে হলে একশ কোটি ডলার করে দেওয়ার শর্ত সামনে আসায় সমালোচকদের অভিযোগ, শান্তির চেয়ে এখানে প্রভাব আর অর্থের রাজনীতিই বেশি স্পষ্ট। যদিও গাজা শান্তি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন পেয়েছে ‘বোর্ড অব পিস’, জাতিসংঘ জানিয়েছে—এই সম্পৃক্ততা কেবল ওই প্রেক্ষাপটেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
সব মিলিয়ে ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ একদিকে নতুন এক বৈশ্বিক আশার কথা বলছে, অন্যদিকে জন্ম দিচ্ছে গভীর সন্দেহের। এটি সত্যিই শান্তির নতুন পথ খুলবে, নাকি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আরেকটি ক্ষমতার মঞ্চ হয়ে উঠবে—সে প্রশ্নের উত্তর আপাতত অজানাই রয়ে গেছে।