রেগুলেটর, হোস পাইপ রাবার সিলে নজর দিন
সরকার নতুন আবাসিক ভবনে পাইপলাইনে সরবরাহকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সংযোগ বন্ধ করে দেওয়ায় এলপিজি সিলিন্ডারের ব্যবহার বাড়ছে। এ ছাড়া লাইনের গ্যাসের চাপ কম থাকায় বিকল্প হিসেবেও বাসায় অনেকে সিলিন্ডার রাখেন। ফলে শহর থেকে গ্রাম; সব জায়গায় সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরশীলতা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু সিলিন্ডার ব্যবহারে অন্যতম বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে মানহীন যন্ত্রাংশ।
সিলিন্ডারের মুখের অংশের ভেতরে পিন এবং রাবারের ওয়াশার থাকে, যা সঠিক নিয়মে পরীক্ষা করা না হলে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। সিলিন্ডার থেকে চুলায় গ্যাস সরবরাহের জন্য ব্যবহৃত রেগুলেটর ও হোস পাইপের মানদণ্ড নির্ধারণ করছে না কোনো প্রতিষ্ঠান। এ সুযোগে বিভিন্ন দোকানে বিক্রি হচ্ছে নিম্নমানের হোস পাইপ ও রেগুলেটর। এতে ব্যবহারকারীরা ঝুঁকির মধ্যে থাকলেও এগুলো দেখার কেউ নেই।
জানা যায়, ঢাকায় গ্যাস রেগুলেটর ও হোস পাইপের বড় মার্কেট পুরান ঢাকার নবাবপুর, আলুবাজার ও সিদ্দিকবাজার। সম্প্রতি একাধিক ব্যবসায়ী ও কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলেছে সমকাল। তারা জানান, অনেক কোম্পানি রেগুলেটর ও হোস পাইপ বাজারজাত করে, যার বেশির ভাগ চীন, তাইওয়ান, জাপান, মালয়েশিয়া ও কোরিয়া থেকে আমদানি করা। সাধারণত এসব পণ্যের মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ থাকে না। মানভেদে প্রতি ফুট পাইপ ১০ টাকা থেকে ৪০ টাকা খুচরা বিক্রি হয়। অধিকাংশ মানুষ কম মূল্যের পাইপ কেনায় আগ্রহী।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, জাপান, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার পাইপ বেশ ভালো। আরএফএল, লিরা, টেকনোলজি তাইওয়ান, এইচএমবিআর, লাকিসহ দেশীয় কোম্পানি রয়েছে। এসব কোম্পানি বেশির ভাগ পাইপ আমদানি করে।
ব্যবসায়ী ও গ্যাসমিস্ত্রিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহারে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হোস পাইপ ও রেগুলেটর। কম মূল্যের হোস পাইপ ব্যবহার করলে তা অল্প সময়ের মধ্যে শক্ত হয়ে ফেটে যায়। এ ছাড়া কম মূল্যের রেগুলেটর বিকল হয়ে লিকেজের ঘটনা ঘটে। এমবি, আরএফএল, মিয়াকো, উইনার, গোল্ডেন ফুজিসহ বিভিন্ন কোম্পানির রেগুলেটর বাজারে রয়েছে। এসব পণ্য বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) মানদণ্ড নির্ধারণ করে না। এসব পণ্যে মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ না থাকায় গ্রাহক দীর্ঘদিন ব্যবহার করায় ঝুঁকি তৈরি হয়। নবাবপুর, মগবাজারসহ কয়েকটি এলাকার দোকান ঘুরে দেখা গেছে, বেশির ভাগ হোস পাইপের গায়ে কোম্পানির নাম লেখা নেই।
রাজধানীর মগবাজারের আহমেদ এন্টারপ্রাইজের গ্যাসমিস্ত্রি আব্দুল লতিফ বলেন, বেশি দিন ব্যবহার করলে রেগুলেটরের চাবি ক্ষয়ে যায়। এর পরও অনেকে তা পরিবর্তন করেন না। হোস পাইপ ছয় মাসের মধ্যে পরিবর্তন করলে ভালো। তবে এক বছরের বেশি ব্যবহার করা উচিত নয়। এ ছাড়া সিলিন্ডারের মুখের অংশের ভেতরে পিন এবং রাবারের ওয়াশার থাকে, যা সঠিক নিয়মে পরীক্ষা করেন না অনেকে। এ কারণে এসব থেকেও দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকে।
গুলিস্তানের ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ডের বিপরীত পাশের রাখি প্লাস্টিক পাইপ হাউসের মালিক মো. ফরিদ বলেন, ১০ টাকা ফুটের পাইপও আছে; ৪০ টাকা ফুটেরও আছে। মানুষ ১০ টাকারটা বেশি কেনে। কোনোটিরই ব্যবহারের মেয়াদ উল্লেখ নেই।
আলুবাজারের মেসার্স রাজীব এন্টারপ্রাইজের কর্মচারী ফজলুল হক বলেন, বিভিন্ন কোম্পানি গ্যাস রেগুলেটর বিদেশ থেকে আমদানির পর নিজেদের নাম দিয়ে বিক্রি করে। ১৮০ থেকে সাড়ে ৩০০ টাকার রেগুলেটর বাজারে রয়েছে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই কোম্পানি চীনসহ কয়েকটি দেশ থেকে রেগুলেটর আমদানি করে। বিএসটিআই মানদণ্ড দিতে পারেনি এখনও। গ্যাসে ব্যবহৃত হোস পাইপ দেশেই উৎপাদন করে আরএফএল।
এ বিষয়ে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল সমকালকে বলেন, রেগুলেটর যে দেশে তৈরি হয়, সে দেশ স্ট্যান্ডার্ড মেনেই তৈরি করে। আমরা যখন রেগুলেটর আমদানি করি, তখন সেই দেশের সার্টিফিকেশন আনা হয়। সেটাকে আমরা স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে ধরি। কারণ, বাংলাদেশে এর আলাদা স্ট্যান্ডার্ড নেই। বিএসটিআই সব পণ্যের মানদণ্ড প্রণয়ন এখনও করতে পারেনি।
মেয়াদোত্তীর্ণ তারিখ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মেটাল প্রডাক্টের ক্ষেত্রে মেয়াদের তারিখ থাকে না। সে ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীকে সতর্ক থাকতে হবে। নিয়মিত পরীক্ষা করা দরকার। হোস পাইপের জন্য আলাদা স্ট্যান্ডার্ড দেওয়া হয় না। বিএসটিআই থেকে দেওয়া পাইপের স্ট্যান্ডার্ড মেনেই হোস পাইপ উৎপাদন করা হয়।
বিএসটিআইর পরিচালক (পদার্থ) শাহাদৎ হোসেন বলেন, রেগুলেটর ও হোস পাইপের মানদণ্ড এখনও দেওয়া হয়নি। পর্যায়ক্রমে এসবের মানদণ্ড দেওয়া হবে। এসব নিম্নমানের যন্ত্রাংশের বিষয়ে কোনো অভিযান চালানো হচ্ছে না বলেও জানান তিনি।
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের মহাসচিব মোহাম্মদ আহসানুল জব্বার বলেন, এলপিজি সিলিন্ডার দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ ক্রস ফিলিং (এক ব্র্যান্ডের সিলিন্ডার অন্য ব্র্যান্ডের গ্যাস দিয়ে ভরা) এবং ডিক্যাটিং (সিলিন্ডারের মধ্যে থাকা অবশিষ্ট গ্যাস বের করে দেওয়া)। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এর সঙ্গে জড়িত। এলপিজি ফিলিংয়ের সময় আমরা আন্তর্জাতিক নীতিমালা অনুসরণ করে থাকি এবং প্রতিটি পর্যায়ে দুর্ঘটনা এড়াতে যথাযথ পরীক্ষা করা হয়।
তিনি আরও বলেন, সিলিন্ডারের লিকেজ থেকে দুর্ঘটনার উদাহরণ পাওয়া যায়নি। এসব দুর্ঘটনার জন্য নিম্নমানের যন্ত্রাংশ অধিকাংশ ক্ষেত্রে দায়ী। নিম্নমানের যন্ত্রাংশের ব্যবহার পরিহার করার জন্য এলপিজি কোম্পানিগুলো ব্যবহারকারী এবং এলপিজি-সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোকে নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছে। এর পরও নিম্নমানের এলপিজি যন্ত্রাংশ বাজারে বিক্রি ও ব্যবহার করতে দেখা যাচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিস্ফোরক পরিদপ্তর ও বিএসটিআইকে যৌথভাবে এলপিজিতে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশের মানদণ্ড নির্ধারণ এবং নিম্নমানের যন্ত্রাংশ বিক্রি নিষিদ্ধ করতে হবে।