রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় আসছে নতুন আইন

বাংলাদেশে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোর ক্রমাগত লোকসান এবং আর্থিক অবস্থা শোচনীয় হয়ে ওঠার কারণে এসব প্রতিষ্ঠান সরকারের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি অর্থনৈতিক ও অ-আর্থিক প্রতিষ্ঠান গুলোর সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব এবং ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় সরকার নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এ আইনের মাধ্যমে দুর্বল লোকসান দানকারী সংস্থাগুলিকে বন্ধ একীভূত বা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার বিধান রাখা হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে অনেক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে লোকসান দিয়ে আসছে যার কারণে সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে পড়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান সরকারকে ব্যাপক আর্থিক বোঝা সৃষ্টি করছে। ফলে সরকারের জন্য অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে একটি সুষম নীতি গ্রহণ করা। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় অর্থ মন্ত্রণালয় নতুন আইন প্রণয়ন করছে যা অধ্যাদেশ আকারে জারি হতে পারে।

নতুন আইনের শিরোনাম সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানসমূহ (ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়) আইন ২০২৫ এর খসড়ায় বলা হয়েছে সরকার কোনো সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার বা একীভূত করার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিলুপ্ত ঘোষণা করার ক্ষমতা অর্জন করবে। এ আইন প্রবর্তনের মাধ্যমে সরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের যথাযথতা পরীক্ষা করার জন্য অর্থ বিভাগ একটি স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করবে। এই কমিটি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বিভাগ এবং সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত হবে এবং এটি যেকোনো প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

এছাড়া নতুন আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক লক্ষ্য ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা গ্রাহক সন্তুষ্টি লেনদেন বিবরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান এসব তথ্য প্রকাশ করতে ব্যর্থ হলে বা ভুল তথ্য দিলে সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এ আইন সংশোধনের মাধ্যমে কোনো প্রতিষ্ঠানে সরকার নিরপেক্ষ পরিচালক বা উপযুক্ত পদে কর্মকর্তাও নিয়োগ করতে পারবে।

সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানসমূহের বাস্তব অবস্থা বেশ চ্যালেঞ্জিং। দেশের ১৩১টি আর্থিক ও ৪৯টি অ-আর্থিক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার কর্মচারী কাজ করছেন। তবে অনেক প্রতিষ্ঠান নিয়মিত লোকসান দিয়ে চলেছে যার ফলে সরকার প্রতিবছর এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করতে বাধ্য হচ্ছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটের নথি অনুযায়ী রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোর লোকসান প্রাক্কলিত পরিমাণ ২৮ হাজার কোটি টাকা। গত অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা। আর্থিক সমীক্ষার তথ্যে দেখা যায় ৪৯টি অ-আর্থিক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কাছে সরকারের পাওনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯৪ হাজার কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণের কিস্তি পরিশোধে অব্যবস্থা এবং যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবের কারণে সরকার এসব প্রতিষ্ঠানে অনেক টাকা ঋণ দেয় কিন্তু সময়মতো সেই ঋণ ফেরত আসছে না।

বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য সরকারি সংস্থাগুলোর কর্মক্ষমতা নিয়ে আনা নানা সমালোচনা এবং সরকারিভাবে বেসরকারীকরণের উদ্যোগও দীর্ঘদিনের। তবে আগের কোনো সরকারের সময় এসব উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। ২০০০ সালে আওয়ামী লীগ সরকার বেসরকারীকরণ কমিশন গঠন করেছিল। কিন্তু ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা করেন আর কোনো রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বেসরকারীকরণ করা হবে না। পরবর্তীতে প্রাইভেটাইজেশন কমিশন বিলুপ্ত করে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) গঠন করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা এই আইন নিয়ে নানা মন্তব্য করেছেন। সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ বলেছেন এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার উদ্যোগ তবে তার সফল বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক অঙ্গীকার অত্যন্ত জরুরি। তিনি মনে করেন শুধুমাত্র অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে গঠিত স্টিয়ারিং কমিটি দিয়ে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বরং সরকারের উচ্চ পর্যায়ের শক্তিশালী সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।

এদিকে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেছেন সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে অব্যবস্থাপনা দুর্নীতি এবং দক্ষতার অভাব অনেক ক্ষেত্রে লোকসান এবং ঋণখেলাপির মূল কারণ। এসব প্রতিষ্ঠানগুলোতে সঠিকভাবে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে এবং দেশ ও জাতির স্বার্থে যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।কঠিন এই সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন করা সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

সরকার এই আইন কার্যকর করতে পারবে কি না। রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং বাস্তবায়নযোগ্য পদক্ষেপ ছাড়া শুধু আইন করে এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা বা বেসরকারীকরণ করা সম্ভব হবে না।যদি সরকার এসব উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে তাহলে এটি সরকারের দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট এবং দুর্বল রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্যা সমাধানে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত হবে।

All Categories