রাজধানীর স্কুলে শিশু নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল
রাজধানীর একটি বেসরকারি স্কুলে শাস্তির নামে শিশু নির্যাতনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, আনুমানিক পাঁচ থেকে ছয় বছর বয়সী এক শিশুকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করছেন দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি, যাদের শিক্ষক বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভিডিওটি মঙ্গলবার (২১ জানুয়ারি) ফেসবুকে শেয়ার করেন অ্যাডভোকেট সালেহ উদ্দিন। সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, গোলাপি রঙের শাড়ি পরা ওই নারীর নাম শারমিন। তার নামেই পরিচালিত হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি, যা ‘শারমিন একাডেমী’ নামে পরিচিত। ফুটেজে দেখা যায়, রাজধানীর পল্টন এলাকার একটি বেসরকারি স্কুলের ভেতরে গোলাপি রঙের শাড়ি পরা এক নারী স্কুল ইউনিফর্ম পরিহিত শিশুটিকে টেনে একটি অফিস কক্ষে নিয়ে যান। পরে শিশুটিকে একটি টেবিলের পেছনে বসে থাকা এক পুরুষের সামনে হাজির করা হয়।
ভিডিওতে আরও দেখা যায়, ভীতসন্ত্রস্ত শিশুটিকে সোফায় বসিয়ে ওই নারী বারবার চড় মারছেন এবং ধমক দিচ্ছেন। জানা গেছে, শিশুটি থুতু দেওয়াকে কেন্দ্র করে তাকে এভাবে মারধর করা হয়। এক পর্যায়ে পুরুষ শিক্ষক একটি স্ট্যাপলার হাতে নিয়ে শিশুটির দিকে এগিয়ে গিয়ে তার মুখে স্ট্যাপল করে দেওয়ার হুমকি দেন। পুরো সময়জুড়ে শিশুটির আচরণে চরম ভয় ও মানসিক আতঙ্কের স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায়।
সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটে ১৮ জানুয়ারি দুপুর আনুমানিক ১২টা ৫১ মিনিটে। ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ জানা না গেলেও ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। অনেকেই শাস্তির নামে এমন নিষ্ঠুর আচরণের নিন্দা জানিয়ে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে তদন্ত শুরু করা হয়েছে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কয়েকজনকে থানায় ডাকা হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের মতিঝিল জোনের সহকারী কমিশনার হুসাইন মো. ফারাবী জানান, মঙ্গলবার ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য শোনা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে এখনো পরিবারটি মামলা বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করতে সম্মত হয়নি। তারা চাইলে আইন অনুযায়ী তাৎক্ষণিকভাবে মামলা গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শাস্তির নামে এ ধরনের সহিংস আচরণ শিশুদের শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। তাদের মতে, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা সমাজের কোনো স্তরেই শারীরিক শাস্তির কোনো বৈধতা নেই।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে শিশু আইন, ২০১৩ কার্যকর রয়েছে। এ আইনে শিশুর প্রতি যেকোনো ধরনের শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, বাস্তবে আইনের প্রয়োগ দুর্বল হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনা পারিবারিক বা সামাজিক ‘শৃঙ্খলা রক্ষার’ অজুহাতে ধামাচাপা পড়ে যায়।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত বেশিরভাগ শিশুনির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না। ফলে বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয় এবং অনেক সময় অভিযুক্তরা শাস্তির বাইরে থেকে যায়। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নজরদারি জোরদার করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্রিয় ভূমিকা জরুরি বলে মনে করেন তারা।