পিআর পদ্ধতি নিয়ে মতভেদ, বিএনপির বিরোধিতা স্পষ্ট
জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনার পর গুরুত্বপূর্ণ এক সিদ্ধান্ত জানিয়েছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন—একই ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান হতে পারবেন না। জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের দাবিকে গুরুত্ব দিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে সংসদ কাঠামো ও ভোট পদ্ধতি নিয়ে এখনো কমিশনের অবস্থান স্পষ্ট নয়।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে আলোচিত ইস্যু হয়ে উঠেছে সংসদ নির্বাচন পদ্ধতির ধরন—বিশেষ করে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক (পিআর) পদ্ধতি গ্রহণ করা হবে কি না।
জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, গণঅধিকার পরিষদসহ ১৮টি দল আনুপাতিক পদ্ধতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাদের দাবি, এতে ভোটের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটবে এবং ছোট দলগুলোরও সংসদে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হবে।
অন্যদিকে বিএনপি ও তার যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলো এই পদ্ধতির বিরোধিতা করছে। বিএনপি এই প্রস্তাবকে ‘গণতন্ত্রের পরিপন্থী’ এবং ‘জনবিচ্ছিন্ন’ আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছে।
দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “বাংলাদেশের মানুষ তাদের নির্বাচনী এলাকায় একজন প্রতিনিধিকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন, তাকে ভোট দেন। পিআর পদ্ধতিতে একাধিক প্রতিনিধি হলে সেই যোগসূত্র নষ্ট হবে, এতে কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ব্যাহত হবে।”
তিনি আরও বলেন, এই পদ্ধতিতে কোনো স্বতন্ত্র বা নির্দলীয় জনপ্রিয় প্রার্থীও নির্বাচিত হলেও সংসদে যাওয়ার সুযোগ পাবেন না। এতে জনগণের প্রকৃত মতামত প্রতিফলিত হবে না।
বিএনপির অভিযোগ, পিআর পদ্ধতির মতো একটি জটিল ও বিতর্কিত ইস্যু সামনে এনে নির্বাচন প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার চেষ্টা করছে সরকারের ঘনিষ্ঠ একটি মহল। দলটির শীর্ষ নেতারা জানিয়েছেন, দলীয় জাতীয় স্থায়ী কমিটির সাম্প্রতিক বৈঠকে এই বিষয়ে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় প্রতিরোধ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বিএনপির আশঙ্কা, পিআর পদ্ধতি চালু হলে কোনো দল এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারবে না। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় দল সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ ভোট পেয়েছে, যা পিআর পদ্ধতিতে আনুপাতিকভাবে অনুবাদ করলে সর্বোচ্চ ১২০টি আসন পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এতে সরকার গঠনের পথ কঠিন হবে, ঝুলন্ত সংসদ সৃষ্টি হবে এবং নীতিনির্ধারণে স্থবিরতা দেখা দেবে।
বিএনপি পরিবর্তে প্রস্তাব করছে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠন। যেখানে নিম্নকক্ষ সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হবে এবং উচ্চকক্ষে আসবে সমাজে অবদান রাখা বিশেষ শ্রেণির প্রতিনিধিরা—রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, ক্রীড়াবিদ, মানবাধিকারকর্মী, নারী ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি। উচ্চকক্ষে আসন বণ্টনের ভিত্তি হবে নিম্নকক্ষে প্রাপ্ত আসনের অনুপাত।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের একটি সূত্র জানিয়েছে, উচ্চকক্ষে পিআর ভিত্তিক আসন বণ্টনের পক্ষে মত দিয়েছেন কমিশনের একাধিক সদস্য। তবে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি।
বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৫৫টি। এর মধ্যে সক্রিয় ৫০টি। এসব দলের মধ্যে ১৮টি পিআর পদ্ধতির পক্ষে, ২৮টি বিপক্ষে এবং চারটি এখনো অবস্থান পরিষ্কার করেনি। ইসলামপন্থি দলগুলোর মধ্যেও বিভাজন স্পষ্ট—পাঁচটি দল পক্ষে, দুইটি বিপক্ষে এবং দুইটি নিরপেক্ষ।
পিআর পদ্ধতি নিয়ে দলগুলোর অবস্থান যতই ভিন্ন হোক, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের রায়ই হবে পরবর্তী রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণের ভিত্তি। বিএনপি বলছে, এই রায়ের ওপরই নির্ভর করছে দেশের ভবিষ্যৎ সংসদ কাঠামো, সরকার গঠনের প্রক্রিয়া ও গণতন্ত্রের গতিপথ।