পান্তাভাতে ঘি নেই, কিন্তু ইলিশ আছে! কীভাবে এলো এই রীতি!
বছর ঘুরে আবার এলো বৈশাখ। বাংলা নববর্ষ মানেই যেন মাটির সানকিতে পান্তা-ইলিশ খেয়ে বাঙালিয়ানা উদযাপন! শৈশবের সেই ‘কানা বগীর ছা’ ছড়াটা মনে আছে? “পান্তা আমি খাই না / পুঁটিমাছ পাই না…” প্রায় ১৪০ বছর আগে লেখা এই ছড়াতে ছিল পান্তার উল্লেখ! এক পান্তাকে ঘিরে আছে ‘পান্তা বুড়ি’ গল্পের মত লোককথা, আছে ‘পান্তাভাতে ঘি’র মতো প্রবাদ। সময়কাল হয়তো নির্দিষ্ট করে বলা যায় না, তবে এসব থেকেই বোঝা যায়—পান্তা এ দেশের এক প্রাচীন ও পরিচিত খাবার।
পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ, একটু নুন… এই সামান্য উপকরণেই যদি জিভে জল আসে, আর সঙ্গে যদি থাকে আলু ভর্তা, ডিম ভাজা কিংবা আগের দিনের নিরীহ কোনো বাসি তরকারি—তাহলে তো কথাই নেই! অনেকেই আবার পাকা কলা দিয়ে মেখেও তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করেন পান্তার স্বাদ।
পান্তা শুধু রুচিকরই নয়, বরং হজমের জন্য বেশ উপকারীও। শোনা যায়, এক সময় গ্রামে চালেরও সংকট ছিল। প্রতিবেলায় নতুন ভাত রান্না ছিল বিলাসিতা! রেফ্রিজারেটর তো দূর কি বাত! বেঁচে যাওয়া ভাতে পানি দিয়ে রেখে দিতেন গৃহিণীরা। খানিকটা হয়তো ‘ভাত ফেলা পাপ’ এই বিশ্বাসও ছিল। সেই ভাতই পরদিন সকালে খেয়ে মাঠে যেতেন কৃষকেরা। যদিও সেই পান্তাভাতে ছিল না কোনো বাহুল্য—ছিল বাস্তবতা আর জীবনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর বুদ্ধি।
কিন্তু পান্তার সঙ্গে ইলিশ কোথা থেকে এলো? অনেকে বলেন, এরশাদের আমলেই প্রথম এই পান্তা-ইলিশ সংস্কৃতির সূচনা। তখন ইলিশ ধরা পড়ত প্রচুর, দামও ছিল সস্তা। এমনকি এতটাই সহজলভ্য হয়ে গিয়েছিল যে অনেকে ইলিশ খেতে খেতে বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলেন!
১৯৮০-৮১ সালের দিকে রমনা বটমূলে সাংবাদিক বোরহানউদ্দিন প্রথম পান্তা-ইলিশ পরিবেশনের রীতি চালু করেন। এরপরের বছর গীতিকার শহীদুল হক খান তা আরও জনপ্রিয় করেন, ছাপান পোস্টার—আর পান্তা-ইলিশ হয়ে ওঠে বৈশাখের অন্যতম রীতিমালা।
আজকের দিনে, পহেলা বৈশাখ এলেই রাজধানী থেকে মফস্বল—সবখানে শুরু হয় পান্তা-ইলিশের উৎসব। তবে এই জনপ্রিয়তার একটা আলাদা প্রভাবও আছে—নববর্ষ ঘিরে ইলিশের চাহিদা বাড়ে বলে জাটকা রক্ষায় সরকারকেও মাছ ধরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হয়!