পাগল সেজে ঘুরে বেড়ানো এক সিরিয়াল কিলারের ছয় খুন

ওয়েব সিরিজ বা ওয়েস্টার্ন সিনেমায় যেসব সিরিয়াল কিলারের গল্প গা ছমছম করে, সাভারের এক পরিত্যক্ত কমিউনিটি সেন্টারে সেই গল্পই যেন বাস্তব হয়ে উঠেছিল। দিনের আলোয় নিঃশব্দ, রাত নামলেই মৃত্যু–ফাঁদ। একের পর এক পোড়া লাশ, পরিচয়হীন দেহ, আতঙ্কে ঘুম হারাম এলাকার মানুষের। আর সেই মৃত্যুর মঞ্চের পিছনে ছিল এমন একজন যা সবার কল্পনার বাইরে ছিল। 

মশিউর রহমান ওরফে সম্রাট (৪০)।দেখলে মনে হবে আরে এমন পাগল তো আমাদের এলাকাতেও আছে। তবে পুলিশের ভাষায়, পাগলের মতো আচরণ করলেও তিনি পাগল নন। তিনি ঠান্ডা মাথার একজন ‘সাইকো টাইপ’ সিরিয়াল কিলার। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেই ছয়টি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন তিনি। বৃদ্ধা, নারী, কিশোরী কাউকেই ছাড়েননি। 

সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টারের পরিত্যক্ত ভবনটি ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছিল এক মৃত্যুকূপে। ভেতর থেকে বারবার মিলছিল পোড়া লাশ। আগুনে ঝলসে যাওয়া দেহের পাশে ছাই, পোড়া কাপড়, দুর্গন্ধ—সব মিলিয়ে এলাকাজুড়ে তৈরি হয়েছিল অদৃশ্য এক ভয়। কে মরছে, কে মারছে আর কেনই না মারছে কেউ জানত না।

রোববার বিকেলে সেই রহস্যের পর্দা সরে। সিসিটিভিতে দেখা যাচ্ছে একটি লাশকে কাঁধে করে নিয়ে যাচ্ছে এক ব্যক্তি। পরিত্যক্ত সেই কমিউনিটি সেন্টারে নিয়ে যাচ্ছে। নিথর সেই লাশের দুটো হাত এদিক সেদিক দুলছে। হয়তো পুড়িয়ে ফেলার জন্য নিয়ে যাচ্ছে। গাঁ হিম করা সেই দৃশ্য। 

পুলিশ ততক্ষণে চিনে ফেলেছে। এই খুনি আর কেউ নয়। ভবঘুরে সাইকো সম্রাট। যাকে এলাকার সবাই চিনে। সাভার থানার সামন থেকেই পুলিশ আটক করে সম্রাটকে। এর কিছু ঘণ্টা আগেই কমিউনিটি সেন্টারের ভেতর থেকে উদ্ধার হয় এক কিশোরীসহ দুজনের পোড়া মরদেহ। সোমবার তাকে ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেছে পুলিশ।

পুলিশ বলছে, সম্রাটের হত্যার ধরন ছিল একই। শ্বাসরোধ করে হত্যা, তারপর প্রমাণ লোপাটে আগুন। যাদের হত্যা করেছেন, তাদের বেশিরভাগই ভবঘুরে—নামহীন, ঠিকানাহীন। হয়তো এ কারণেই এতদিন ধরা পড়েননি।

ঢাকার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম, অপস অ্যান্ড ট্রাফিক উত্তর) আরাফাতুল ইসলাম জানান, সম্রাট প্রথম খুন করেন ২০২৫ সালের ৪ জুলাই। সাভার মডেল মসজিদের সামনে রাতে আসমা বেগম নামে এক বৃদ্ধাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। এরপর শুরু হয় ধারাবাহিক মৃত্যু।

২৯ আগস্ট কমিউনিটি সেন্টারের ভেতরে এক যুবককে হত্যা করে লাশ পুড়িয়ে দেন। ১১ অক্টোবর উদ্ধার হয় আরেক নারীর মরদেহ। ১৯ ডিসেম্বর আরও এক যুবক। আর সবশেষ গত শনিবার—এক কিশোরীসহ দুজন। প্রতিটি খুনের পর একই জায়গা, একই নীরবতা, একই আগুন।

সবচেয়ে ভয়ের তথ্যটা দিয়েছে পুলিশ—সম্রাট দেড় বছরের বেশি সময় ধরে থানার আশপাশেই ঘোরাফেরা করতেন। কখনো লুঙ্গি, কখনো শার্ট, কখনো অদ্ভুত পোশাক। এলোমেলো কথা বলতেন, নিজেই নিজে হাসতেন। সবাই ভেবেছিল তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন। কিন্তু আড়ালে চলছিল হিসেবি এক খুনির খেলা।

সাভার থানার পরিদর্শক (অপারেশন) হেলাল উদ্দিন জানান, রোববার রাতে কমিউনিটি সেন্টারে আরেক ভবঘুরে নারীকে হত্যার পরিকল্পনাও ছিল সম্রাটের। সুযোগ পেলে লাশীর সংখ্যা বাড়ত আরও একটি।

পুলিশ এখন খতিয়ে দেখছে, এই ছয় খুনই শেষ কি না। আরও কোনো নিখোঁজ মানুষের সঙ্গে এই  ‘পাগল’ সম্রাটের সম্পর্ক আছে কি না। কারণ যে মানুষটি দিনের বেলায় থানার সামনে ঘোরে, তার পক্ষে রাতে কতটা ভয়ংকর হওয়া সম্ভব সাভার সেই ভয়টাই দেখেছে।

 

All Categories