কলকাতায় 'পার্টি অফিস' খুলে সক্রিয় রাজনৈতিক তৎপরতায় আওয়ামী লীগ
ভারত থেকে কার্যত পরিচালিত হচ্ছে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ। দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা রয়েছেন দিল্লির আশপাশে, আর দলের শীর্ষ ও মধ্যম পর্যায়ের বহু নেতা রয়েছেন কলকাতা ও তার লাগোয়া শহরতলিতে। সেখানেই চালু হয়েছে দলটির একটি অঘোষিত পার্টি অফিস। কলকাতার এক বাণিজ্যিক কমপ্লেক্সের আট তলার এক নিরিবিলি ফ্ল্যাটে চলছে দলীয় কাজকর্ম। তবে বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই এটি আওয়ামী লীগের দপ্তর।
দপ্তরটিতে নেই কোনো সাইনবোর্ড, নেত্রীর ছবি, এমনকি বঙ্গবন্ধুর ছবিও না। একটি বাণিজ্যিক সংস্থার পুরনো চেয়ারে বসেই চলছে দলীয় বৈঠক। নিয়মিত যাতায়াত করেন ৩০-৩৫ জনের মতো নেতা, বড় বৈঠকগুলো হয় ভাড়া করা রেস্তোরাঁ বা হলঘরে। কলকাতা ও আশেপাশে অবস্থানরত নেতাদের জন্য এটি এখন দলীয় যোগাযোগ ও সমন্বয়ের প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছাড়ার পরই একে একে ভারত চলে আসেন আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতারা। দলীয় সূত্রের দাবি, বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন দলটির প্রায় ৮০ জন সংসদ সদস্য এবং সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতারা। অনেকে আবার কলকাতাকে ট্রানজিট করে চলে গেছেন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা বা ইউরোপে।
আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হুসেইনও আছেন ভারতে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে তিনি দেশ ছেড়েছেন। বলছেন, আমি নিজে গত এক বছর ক্যাম্পাস মিস করছি। কিন্তু হাজার হাজার কর্মী দেশে থেকেও ক্যাম্পাসে যেতে পারছে না। পরীক্ষা দিলেও সার্টিফিকেট পাচ্ছে না।
দলের নেতা পঙ্কজ দেবনাথ বলেন, ভার্চুয়াল মাধ্যমে তারা সংগঠন চালিয়ে যাচ্ছেন। হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম গ্রুপ এবং লাইভ সেশন এসবই এখন দল পরিচালনার প্রধান হাতিয়ার। এসব সেশনে মাঝেমধ্যে যুক্ত হন শেখ হাসিনাও। এসব মাধ্যমেই মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হয়।
ভারতে অবস্থানকারী নেতাদের ব্যক্তিগত ব্যয়ভারও হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। দলীয় নেতা-কর্মীদের এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের অর্থ সহায়তায়ই চলছে এই তৎপরতা। দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়েদুল কাদের বলেন, এই দুঃসময়ে কেউ গাড়ি ছাড়াই চলছেন, কেউ গণপরিবহনে যাচ্ছেন। মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত জীবনযাত্রা বদলে ফেলতে হয়েছে আমাদের।
তিনি বলেন, যতদিন না দেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়, দল আবার সংঘবদ্ধ হতে পারে, ততদিন এই সংগ্রাম চালিয়ে যেতেই হবে।
তবে আওয়ামী লীগ ভারতে বসে দল পরিচালনার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হুসেইন বলেন, মূল দল এখনো বাংলাদেশেই রয়েছে। ভারতে যারা আছেন, তারা পরিস্থিতির কারণেই এখানে অবস্থান করছেন।
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া এই দপ্তর চালানো সম্ভব নয়। ফলে অন্তত এক বছর ধরে ভারতের ছায়াতেই আওয়ামী লীগের সংগঠনিক কাঠামো ও কৌশল নির্ধারিত হচ্ছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, বর্তমান সরকার ব্যর্থতার দায় অন্যের ওপর চাপানোর চেষ্টা করছে। ওবায়েদুল কাদের বলেন, শেখ হাসিনার সময়েই মানুষ ভালো ছিল—এ কথা এখন অনেকেই বলছেন।
নতুন সরকারের এক বছর পূর্তিতে আওয়ামী লীগের ভার্চুয়াল প্রচার জোরদার হয়েছে। দলীয় নেতারা বলছেন, এবার রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরার সময় এসেছে। তাই ভারতে থেকেই সংগঠনের পুনর্গঠন, বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কাজ এগিয়ে নিচ্ছেন তারা। তবে তাদের মনেও প্রশ্ন—এই নির্বাসিত রাজনীতি কতদিন চলবে?
সূত্র: বিবিসি বাংলা