কেয়ারিং হ্যান্ডস ডে কেয়ার ও লাইব্রেরি

বর্তমান নগরজীবনে কর্মজীবী মা-বাবার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো—সন্তানের সঠিক যত্ন ও বিকাশ নিশ্চিত করা। বিশেষ করে ব্যস্ত শহুরে জীবনে, যেখানে পরিবার ছোট হয়ে এসেছে এবং সহায়তার পরিধি সীমিত, সেখানে একটি নিরাপদ ও উন্নত পরিবেশের ডে কেয়ারের প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বাড়ছে।

এই বাস্তবতা থেকেই গড়ে উঠেছে -এর “কেয়ারিং হ্যান্ডস ডে কেয়ার ও লাইব্রেরি" —একটি ভিন্নধর্মী সামাজিক উদ্যোগ, যেখানে সেবাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে মুনাফার চেয়ে।

উদ্যোক্তাদের ভাষায়, এই উদ্যোগ শুধুমাত্র একটি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা নয়, বরং একটি দায়িত্ববোধ থেকে শুরু হয়েছে। তারা চাইলে একই পরিমাণ বিনিয়োগে অন্য খাতে বেশি মুনাফা অর্জন করতে পারতেন। কিন্তু সেই পথ না বেছে নিয়ে তারা এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে চেয়েছেন, যেখানে মানুষ প্রকৃত সেবা পাবে—বিশেষ করে চিকিৎসক ও কর্মজীবী মায়েরা, যারা প্রতিনিয়ত তাদের ক্যারিয়ার ও সন্তানের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে সংগ্রাম করেন। এখানকার উদ্যোক্তাদের অধিকাংশই চিকিৎসক, সাথে আছেন অন্যান্য পেশাজীবীরা যারা তাদের নিজেদের ক্যারিয়ারের অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনীয়তার আলোকে এটি করেছেন৷

এই উদ্যোগের আরেকটি বিশেষ দিক হলো এর সঙ্গে সংযুক্ত লাইব্রেরি সুবিধা। এখানে শুধু শিশুদের জন্য নয়, বরং তাদের অভিভাবকদের জন্যও একটি প্রোডাক্টিভ পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। প্রয়োজনে মাঝেমধ্যে এসে সন্তানের খোঁজ নেওয়ার সুযোগও রয়েছে। তাছাড়া সার্বক্ষণিক সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে অভিভাবক বাচ্চার অবস্থান দেখতে পারবেন।

উদ্যোক্তারা জানান, এমবিবিএস পাশ করার পরও চিকিৎসকদের একটা বড় সময় পোস্ট গ্রাজুয়েশন ডিগ্রী অর্জনে চলে যায়। বিশেষ করে একজন নারী চিকিৎসক যার ছোট বাচ্চা আছে তার কাছে এটা খুবই কঠিন হয় সংসার ও ক্যারিয়ারের মধ্যে সমন্বয় করা। সেই সমস্যা সমাধানে লাইব্রেরী ও ডে কেয়ার একটি সমন্বিত উদ্যোগ। বাচ্চা ডে কেয়ারে থাকবেন, মা লাইব্রেরিতে পড়বেন। একই ভাবে গবেষক, চাকুরী প্রত্যাশী বা ফ্রিল্যান্সারদের জন্য একটা জায়গা হিসেবে ডে কেয়ারটি প্রশংসা পাচ্ছে৷

এই উদ্যোগে মুনাফা মুখ্য নয়; বরং দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সমাজের জন্য ভিন্নভাবে কিছু করার ইচ্ছাই তাদের প্রেরণা।

বর্তমান সময়ে শিশুদের মধ্যে মোবাইল ফোন আসক্তি একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু কর্মজীবী মা-বাবাই নয়, অনেক ক্ষেত্রে গৃহিণী মায়েরাও দৈনন্দিন কাজের সুবিধার্থে শিশুকে শান্ত রাখার জন্য ফোনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। খাওয়ানোর সময়, মায়ের কাজের সময়, কিংবা শিশুকে ব্যস্ত রাখার জন্য—মোবাইল ফোন যেন একটি সহজ সমাধান হয়ে উঠেছে।

কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব উদ্বেগজনক। এতে শিশুর মেধাবিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং স্বাভাবিক সামাজিকীকরণ ব্যাহত হয়। বাস্তব জীবনের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, খেলাধুলা ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে যে শেখার প্রক্রিয়া হওয়ার কথা, তা সীমিত হয়ে পড়ে।

এই প্রেক্ষাপটে একটি মানসম্মত ডে কেয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কেয়ারিং হ্যান্ডস ডে কেয়ারে শিশুদের এমন একটি পরিবেশে রাখা হয়, যেখানে তারা স্ক্রিনের বাইরে থেকে বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিখতে পারে, খেলতে পারে এবং সামাজিক দক্ষতা অর্জন করতে পারে। পান্থপথের একটি বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত একজন চিকিৎসক জানান, তিনি বাসায় গৃহকর্মী রেখেছিলেন তবে গৃহকর্মী বাচ্চার সামনে মোবাইল দিয়ে নিজে টেলিভিশনে ব্যস্ত থাকেন। সেজন্য তিনি এই ডে কেয়ারকে বেছে নিয়েছেন।  

গ্রীনরোড, ধানমন্ডি ও সেন্ট্রাল রোড এলাকার বাসিন্দাদের জন্য এই উদ্যোগটি ইতোমধ্যে একটি আস্থার জায়গা হয়ে উঠেছে। মাসিক চার্জও রাখা হয়েছে সাধ্যের মধ্যে, যাতে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সহজেই এই সেবার আওতায় আসতে পারে।

উদ্যোক্তারা মনে করেন, এই ধরনের উদ্যোগ টেকসইভাবে চালিয়ে যেতে কমিউনিটির সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই তারা এলাকার অভিভাবকদের একবার অন্তত ভিজিট করে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন।

শিশুর প্রাথমিক বিকাশের সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে সঠিক পরিবেশ, যত্ন ও দিকনির্দেশনা একটি শিশুর ভবিষ্যৎ গঠনে বড় ভূমিকা রাখে। সেই দায়িত্বকে গুরুত্ব দিয়েই কেয়ারিং হ্যান্ডস ডে কেয়ার নিজেদের পথচলা শুরু করেছে—একটি নিরাপদ, যত্নশীল ও শেখার পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে।

এটি শুধু একটি ডে কেয়ার নয়; বরং একটি সামাজিক উদ্যোগ, যেখানে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এবং তাদের অভিভাবকদের জন্য একসঙ্গে কাজ করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান গ্রীনরোড এর ৭ নং রোড, ২ নং ভবন রূপায়ণ প্রাইমে। ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতাল ও নিউ লাইফ হাসপাতাল এর বিপরীতে।

All Categories