কাপ্তাই হ্রদে নৌযান চলাচল বন্ধের আশঙ্কা
তেল সংকটের কারণে রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদে নৌযান চলাচল বন্ধের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। হ্রদে নৌযান চলাচল চালু রাখতে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনের প্রতি দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
১৯৬১ সালে খরস্রোতা কর্ণফুলী নদীর ওপর রাঙামাটির কাপ্তাই নামক স্থানে বাঁধ দেওয়ার পর সৃষ্টি হয় কাপ্তাই হ্রদ। ৭২৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই হ্রদ সৃষ্টি হওয়ার পর জেলার ১০টি উপজেলার মধ্যে সাতটি উপজেলায় হ্রদের নৌরুট ব্যবহার করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কাপ্তাই হ্রদে ১০টি নৌরুটে যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল করে। দ্বিতল কাঠের তৈরি সুদৃশ্য এই লঞ্চের পাশাপাশি বিভিন্ন গ্রামে চলাচল করে আরো কয়েক শ ইঞ্জিনচালিত নৌকা। তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরু হওয়ার পর থেকে দেশব্যাপী জ্বালানি সংকটের আঁচ পড়েছে পাহাড়ি জেলা রাঙামাটির দুর্গম এলাকার বাসিন্দাদের ওপরও।
লঞ্চ মালিকদের দাবি, আর মাত্র দুই-তিন দিনের রিজার্ভের তেল শেষ হলেই হ্রদে লঞ্চ চলাচল বন্ধের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া নৌকার মালিক কিংবা শ্রমিকরা দীর্ঘ সারি ধরে যতটুকু তেল পাচ্ছেন, সেটা দিয়েই নৌযান সচল রেখেছেন তারা। জ্বালানি তেলের অভাবে মৌসুমি পণ্য পরিবহনেও ভাটা পড়েছে। বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে স্পিডবোট চলাচলও।
লঞ্চ মালিক সমিতির নেতারা বলেন, কাপ্তাই হ্রদে ১০টি রুটে চলাচল করে ২৮টি লঞ্চ।
এতে দৈনিক ১২০০ লিটার থেকে ১৫০০ লিটার তেলের প্রয়োজন হয়। বর্তমানে এসব রুটে লঞ্চ চলাচলে দুই থেকে আড়াই দিন লঞ্চ চলাচলের মতো তেল মজুদ রয়েছে। এরপর আদৌ তেল পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তারা। ইতিমধ্যে বিআইডব্লিউটিএ, জেলা প্রশাসক ও ইউএনওকে বিষয়টি জানিয়েছেন লঞ্চ মালিকরা। তবে উল্লেখযোগ্য সমাধান মিলছে না বলে অভিযোগ তাদের।
সমিতির নেতারা আরো বলেন, সংকটের মধ্যে ফিলিং স্টেশনগুলোতে কিছুটা তেল সরবরাহ হলেও, নৌযানের সঙ্গে যুক্ত এজেন্টদের তেল সরবরাহে অনীহা দেখাচ্ছেন পদ্মা অয়েল কম্পানির প্রতিনিধিরা। এতে যেকোনো সময় কাপ্তাই হ্রদে নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
তবে নৌযান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে নির্ধারিত একটি প্রতিষ্ঠানকে জ্বালানি তেল সরবরাহের জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন রাঙামাটি সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ কামরুল হোসেন চৌধুরী। তিনি বলেন, নৌযান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে নির্ধারিত একটি প্রতিষ্ঠানকে জ্বালানি তেল সরবরাহের জন্য অনুরোধ জানিয়েছি। আশা করছি, ধীরে ধীরে সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে।
স্পিডবোট ঘাটের লাইনম্যান মো. মহিউদ্দিন বলেন, আগে রাঙামাটি থেকে প্রতিদিন হ্রদের বিভিন্ন রুটে ১৫ থেকে ২০টি স্পিডবোট চলাচল করতো। কিন্তু বর্তমানে তেলের সংকটের কারণে পাঁচ থেকে সাতটি স্পিডবোট চলাচল করতে পারছে। তেলের অভাবে যেকোনো সময় স্পিডবোট চলাচলও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
ইঞ্জিনচালিত নৌকায় মৌসুমী পণ্য পরিবহনকারী সুমন চৌধুরী বলেন, আগে বিভিন্ন গ্রাম থেকে দৈনিক ১৫ থেকে ২০টি নৌকা মৌসুমি ফল নিয়ে শহরের সমতাঘাট, ট্রাক টার্মিনাল ঘাটসহ বিভিন্ন ঘাটে পণ্য পরিবহন করা হতো। হাটের দিন সেই সংখ্যা দ্বিগুণ হতো। বর্তমানে তেলের অভাবে পাঁচ থেকে সাতটি নৌকা পণ্য পরিবহন করছে। নৌকার অভাবে অনেকেই মৌসুমী ফল যেমন তরমুজ, আনারস, কলাসহ পণ্য পরিবহন করতে পারছে না। এতে কৃষকরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি আমরাও পণ্য পরিবহন করতে না পেরে আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছি।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌচলাচল যাত্রী পরিবহন সংস্থা রাঙামাটি জোনের চেয়ারম্যান মঈনুদ্দীন সেলিম বলেন, তেল যা মজুদ রয়েছে- তা দিয়ে সর্বোচ্চ দুই থেকে আড়াই দিন চলবে। এর মধ্যে তেল পাওয়া গেলে তবেই লঞ্চ চলাচল করবে, না হয় বন্ধ হয়ে যাবে। তেলের সরবরাহ বাড়ানোর জন্য বিআইডব্লিউটিএসহ বিভিন্ন সংস্থাকে অনুরোধ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।বিআইডব্লিউটিএ চট্টগ্রামের উপপরিচালক (বন্দর ও পরিবহন) নয়ন শীল বলেন, রাঙামাটি নৌযান সমিতির কাছ থেকে আমরা চিঠি পেয়ে পদ্মা অয়েলকে জানিয়েছি এবং তারা কিছু তেলও দিয়েছে। সমস্যা সমাধানে আমরা পদ্মা অয়েলকে আবার চিঠি দেব।