জয় দাবিতে সরব তিন পক্ষই! ইরান,ইসরায়েল,আমেরিকার পক্ষে বিপক্ষে যুক্তি, পাল্টা যুক্তি কী

দীর্ঘ ১২ দিনের সংঘাতের পর অবশেষে যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছেছে ইরান ও ইসরায়েল। মার্কিন মধ্যস্থতায় এই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এলেও থেমে নেই দাবির লড়াই। ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র—তিন পক্ষই নিজেদের জয়ী বলে দাবি করছে।

তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। কে জিতেছে আর কে হারিয়েছে, সেটি নির্ধারণের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এই সংঘাতের মাধ্যমে কে কী বার্তা দিতে চেয়েছে এবং ভবিষ্যতের ভূরাজনীতিতে এর প্রভাব কতটা গভীর হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র: ‘ইরানের পরমাণু পরিকল্পনায় লাগাম’

ইরানের পরমাণু কর্মসূচি থামাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর গত সপ্তাহে ইরানের তিনটি পরমাণুকেন্দ্রে বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। যদিও মার্কিন গোয়েন্দাদের প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের পরিকাঠামোর পুরোপুরি ধ্বংস না হলেও, তা উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে গেছে।

এদিকে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, তাঁর নেতৃত্বেই হামলা হয়েছে এবং সেই হামলার মাধ্যমেই যুদ্ধ থেমেছে। তিনি বলেন, ‘‘আমি কেবল ইরানের পরমাণু অবকাঠামো ভেঙে দিইনি, যুদ্ধও থামিয়েছি।’’

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই দাবি তার পুনর্নির্বাচনী প্রচারণার কৌশলের অংশ, বিশেষ করে যখন তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কারের ইচ্ছা প্রকাশ করে আসছেন বহুদিন ধরে।

ইসরায়েল: ‘অস্তিত্বের হুমকি দূর করেছি’

যুদ্ধবিরতির পর ইসরায়েলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা ইরানের দুটি মূল হুমকি—পরমাণু ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি—দমনে সফল হয়েছে।

তেলআবিব দাবি করেছে, এই সংঘাতে ইরানের অন্তত ৯ জন পরমাণুবিজ্ঞানী ও কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, ‘‘আমরা যুদ্ধক্ষেত্রে সফল হয়েছি। এটি কেবল ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য নয়, গোটা অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্যই জরুরি ছিল।’’

কিন্তু কিছু বিশ্লেষকের মতে, এই হামলা আন্তর্জাতিক চাপ থেকে দৃষ্টি ঘোরাতে এবং অভ্যন্তরীণ সমালোচনা মোকাবেলায় নেতানিয়াহুর একটি কৌশল হতে পারে।

ইরান: ‘প্রতিরোধই আমাদের বার্তা’

যুদ্ধবিরতির পর তেহরান জানিয়েছে, হামলার মুখে তারা শুধু প্রতিরোধই করেনি, বরং কাতারে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতেও পাল্টা হামলা চালিয়েছে।

ইরানের দাবি, তাদের পরমাণু কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি। মার্কিন তথ্যেও জানা গেছে, ৪০০ কেজির বেশি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের হদিস এখনও মেলেনি।

এই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ইরানের ভেতরে সরকারপন্থী ও সরকারবিরোধী গোষ্ঠীর মধ্যে বিরল ঐক্যও দেখা গেছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির নেতৃত্বে সরকারকে সমর্থন দিয়েছেন এমন অনেকেই, যারা আগের মাসগুলোতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন।

তবে সংঘাতের মূল্যও কম নয়। ইরানের সেনাপ্রধানসহ বহু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন, নিহত হয়েছেন সাধারণ মানুষও।

এখন কী হবে?

যুদ্ধ থামলেও উত্তেজনা কমেনি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মঙ্গলবার জানান, তিনি আর ইরানে সরকার পরিবর্তনের পক্ষপাতী নন।

বিশ্লেষকদের মতে, কেউই পুরোপুরি জয়ী বা পরাজিত নয়। বরং এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত ভারসাম্যে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে, যার প্রতিক্রিয়া এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান নয়।

এই সংঘাত হয়তো আপাতত থেমেছে, কিন্তু এর রেশ দীর্ঘস্থায়ী। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এখন এক নতুন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে—যেখানে প্রতিটি দাবি, প্রতিটি পাল্টা দাবিই ভবিষ্যতের পথরেখা গড়ে দিতে পারে।

All Categories