ইরানের ইউরেনিয়াম শুদ্ধিকরণ কত দূর? পরমাণু অস্ত্রে পরিণত হতে আর কত বাকি?

ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের দশম দিনেই ইরানের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পরমাণুকেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের পরমাণু সমৃদ্ধিকরণের ক্ষমতাকে “সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া” তাঁদের লক্ষ্য।

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, হামলায় ‘নিশ্চিহ্ন’ করে দেওয়া হয়েছে ভূগর্ভস্থ পরমাণুকেন্দ্র ফোরডোসহ আরও দুটি কেন্দ্র। তবে ইরান বলছে, হামলা হলেও কোনো কেন্দ্রে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ঘটেনি। ফলে কেন্দ্র সংলগ্ন এলাকার জনগণ নিরাপদেই আছেন।

তেহরান এই হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছে, রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হয়েও যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক নিয়ম লঙ্ঘন করেছে। এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে দেশটি।

কেন এত উদ্বেগ ইরানকে ঘিরে?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মনে করে, ইরান শিগগিরই পরমাণু শক্তিধর দেশে পরিণত হতে পারে, যা শুধু পশ্চিম এশিয়ার নয়, গোটা বিশ্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠবে। তারা আশঙ্কা করছে, ইরান যখন-তখন পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে।

অন্যদিকে ইরান শুরু থেকেই দাবি করে আসছে, তাদের পরমাণু গবেষণা সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং জনগণের স্বার্থেই তা পরিচালিত হচ্ছে।

পরমাণু অস্ত্রের জন্য কী লাগে?

পরমাণু অস্ত্র তৈরির মূল উপাদান ইউরেনিয়ামের একটি বিশেষ আইসোটোপ—ইউরেনিয়াম-২৩৫। প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামে এটি মাত্র ০.৭ শতাংশ থাকে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৩–৫ শতাংশ বিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম লাগে, তবে পরমাণু অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজন অন্তত ৯০ শতাংশ বিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম।

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) জানায়, ইরান বর্তমানে ইউরেনিয়াম ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বিশুদ্ধ করছে, যা বেশ উদ্বেগজনক।

ইরানের তিনটি প্রধান পরমাণুকেন্দ্র হলো:

ফোরডো: তেহরান থেকে ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত এই ভূগর্ভস্থ কেন্দ্র মাটি থেকে ৩০০ ফুট গভীরে। এটি রাশিয়ার এস-৩০০ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় সুরক্ষিত। যুক্তরাষ্ট্র এই কেন্দ্রে ‘বাঙ্কার বাস্টার’ বোমা ফেলার দাবি করেছে।

নাতান্‌জ়: ইরানের কেন্দ্রীয় মালভূমিতে অবস্থিত। একে ইরানের ইউরেনিয়াম বিশুদ্ধকরণের কেন্দ্র হিসেবে ধরা হয়। মাটির উপরের অংশে ইসরায়েলের হামলায় কিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি।

ইসফাহান: দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত, যেখানে ইরানের সবচেয়ে বড় পরমাণু গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে। প্রায় ৩ হাজার বিজ্ঞানী এখানে কাজ করেন। ১৯৮৪ সালে এটি চীনের সহায়তায় নির্মিত হয়।

ইরান কতটা এগিয়েছে?

গোপনীয়তার চাদরে মোড়া ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে বিশ্লেষকদের স্পষ্ট ধারণা নেই। তবে IAEA বলছে, ইরান এরই মধ্যে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম পরিশোধন করতে পারছে। ফোরডো কেন্দ্রে প্রতি মাসে ১৬৬ কেজি এমন ইউরেনিয়াম উৎপাদিত হয়। অনেকে আশঙ্কা করছেন, গোপনে তারা হয়তো ইতোমধ্যেই ৯০ শতাংশ বিশুদ্ধতার সীমা ছুঁয়ে ফেলেছে।

পরমাণু চুক্তি ও লঙ্ঘন

২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রসহ ছয়টি দেশের সঙ্গে ইরানের একটি পরমাণু চুক্তি হয়। সেখানে ইউরেনিয়াম পরিশোধনে সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। তবে ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রকে ওই চুক্তি থেকে সরিয়ে নেয়। এর পর থেকেই ইরান পর্যায়ক্রমে চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে।

IAEA-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ইরানের সংরক্ষিত পরিশোধিত ইউরেনিয়ামের পরিমাণ এখন ৯.২ টনের বেশি, যেখানে চুক্তিতে সীমা ছিল ২০২.৮ কেজি।

আন্তর্জাতিক উদ্বেগ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের টানা হামলার পরও এখন পর্যন্ত কোনো পরমাণুকেন্দ্রে তেজস্ক্রিয় বিকিরণের খবর পাওয়া যায়নি। তবে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ বিরাজ করছে। ইরানের পরমাণু সক্ষমতা রুখতে এই সংঘাত আরও বিস্তৃত আকার নেবে কি না—এমন শঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

All Categories