ইরানে হামলার আশঙ্কায় উত্তেজনা

মধ্যপ্রাচ্যে বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনসহ বিপুল সামরিক শক্তি মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। পর্যবেক্ষকদের মতে, এর মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানের ওপর বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে ওয়াশিংটন। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এই সামরিক সমাবেশের মূল লক্ষ্য ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দুর্বল করে সরকার পতনের পথ তৈরি করা।

মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসকারী রণতরিগুলো এখনো চূড়ান্ত অবস্থানে না পৌঁছালেও ইরানের ওপর আঘাত হানার কার্যকর সীমানার মধ্যেই রয়েছে। তবে সম্ভাব্য মার্কিন হামলায় ইরানে নতুন করে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দানা বাঁধবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ, ১৯৭৯ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা কট্টরপন্থী নেতৃত্বের সমালোচক হলেও বহু ইরানি বিদেশি শক্তির মাধ্যমে শাসন পরিবর্তনের পক্ষপাতী নন।

কূটনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যেই গত সোমবার ইরানের পুঁজিবাজারে রেকর্ড দরপতন হয়। এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি আঞ্চলিক শক্তি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ইরানের ওপর হামলার জন্য তারা নিজেদের আকাশসীমা বা জলসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেবে না। তবে ভূমধ্যসাগরে মার্কিন রণতরির উপস্থিতির কারণে অনেক ক্ষেত্রেই তৃতীয় কোনো দেশের অনুমতির প্রয়োজন পড়বে না বলে মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকেরা।

এরই মধ্যে গত সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যে একটি সামরিক মহড়ার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, এই মহড়ার উদ্দেশ্য হলো—যুদ্ধের প্রয়োজন হলে কত দ্রুত যুদ্ধজাহাজ থেকে যুদ্ধবিমান ওঠানামা করানো যায়, সেই সক্ষমতা যাচাই করা।

বিশ্লেষকদের মতে, সম্ভাব্য এই হামলার মূল লক্ষ্য ইরানের আগে থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত পরমাণু কর্মসূচি নয়। বরং লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বকে। উদ্দেশ্য হলো, জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনৈতিক সংকটে ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষকে আবার রাস্তায় নামতে উৎসাহিত করা। সরকারি তথ্যমতে, গত মাসে ইরানে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬০ শতাংশে।

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব আলী লারিজানি অভিযোগ করেছেন, সামরিক হামলার আগেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামাজিক সংহতি দুর্বল করার চেষ্টা করছে। তাঁর দাবি, দেশটিকে ‘জরুরি পরিস্থিতি’র দিকে ঠেলে দেওয়ার এই প্রচেষ্টা কার্যত যুদ্ধেরই একটি রূপ।

এদিকে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সম্ভাব্য কূটনৈতিক আলোচনা চলছে—এমন দাবি নাকচ করেছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই একে ‘মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দেন। তিনি জানান, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী প্রতিটি সামরিক গতিবিধি সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং আগ্রাসনের জবাবে ‘সর্বাত্মক ও অনুশোচনাজনক’ প্রতিক্রিয়া জানানো হবে।

বাঘাই আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে সেনা মোতায়েন ও হুমকি প্রদান আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। এসব নীতি লঙ্ঘন করা হলে পুরো অঞ্চলই অনিরাপদ হয়ে উঠতে পারে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগেও ইরানে হামলার চিন্তা থেকে সরে এসেছিলেন। দুই সপ্তাহ আগে বিক্ষোভ চরমে পৌঁছালেও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে সরানোর স্পষ্ট পরিকল্পনা এবং সম্ভাব্য ইরানি পাল্টা হামলা থেকে ইসরায়েলকে রক্ষার পূর্ণাঙ্গ কৌশল না থাকায় শেষ মুহূর্তে হামলা স্থগিত করেন তিনি। তবে বিক্ষোভকারীদের সহায়তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়ায় অনেক ইরানির মধ্যেই ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। ৯ কোটি জনসংখ্যার একটি দেশে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের ঝুঁকি নিয়ে খোদ মার্কিন প্রশাসনের ভেতরেও মতভেদ রয়েছে।

ইউরোপীয় রাজনীতিতেও এই উত্তেজনার প্রভাব পড়ছে। ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি জানিয়েছেন, তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রবিষয়ক কাউন্সিলে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে (আইআরজিসি) নিষিদ্ধ সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করার প্রস্তাব দেবেন।

All Categories