ফেব্রুয়ারির রপ্তানিতে বড় পতন, সামনেও শঙ্কা
রপ্তানি আয়ে টানা পতন সাত মাসে গড়াল।গত ফেব্রুয়ারি মাসে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি কমেছে ১২ শতাংশের মতো। এর আগে গত জানুয়ারিতে রপ্তানি কমে যায় শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। প্রধান পণ্য তৈরি পোশাকের রপ্তানি এই গড়ের চেয়েও বেশি। মাসটিতে পোশাক রপ্তানি কমেছে ১৩ শতাংশেরও বেশি। অন্যান্য বড় পণ্যের বেলায়ও একই গতি। তবে ছোটখাটো কয়েকটি পণ্যের রপ্তানি কিছুটা বেড়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি হয় ২৫ শতাংশের মতো। এরপর প্রতি মাসেই রপ্তানি কমছে।
প্রতি মাসে গড়ে সাড়ে ৪০০ কোটি ডলারের মতো রপ্তানি আয় হয়ে থাকে। তবে ২৮ দিনের মাস ফেব্রুয়ারিতে রপ্তানি আয় এসেছে ৩৫০ কোটি ডলারের কিছুটা কম। এই আয় আগের মাস জানুয়ারির চেয়ে ২১ শতাংশ কম। জানুয়ারি মাসের রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ছিল ৪৪১ কোটি ডলার। অন্যদিকে এই অর্থবছরের প্রথম ৮ মাসে রপ্তানি কমেছে আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৩ দশমিক ১৫ শতাংশ। গত ৮ মাসে রপ্তানি আয়ের পরিমাণ তিন হাজার ১৯১ কোটি ডলারের মতো। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে এটি ছিল তিন হাজার ২৯৪ কোটি ডলারেরও কিছু বেশি। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) হালনাগাদ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
জানতে চাইলে তৈরি পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারক উদ্যেক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান সমকালকে বলেন, একাধিক কারণে ফেব্রুয়ারি মাসে রপ্তানি এতটা কমেছে। প্রথমত, জাতীয় নির্বাচনের কারণে অতিরিক্ত তিন দিনের মতো কারখানা বন্ধ ছিল। এ কারণে তিন দিনের রপ্তানি আয় কম। মাস ছিল ২৮ দিনের, সেখানে দুই দিন কম। এই পাঁচ দিনের উৎপাদন ও রপ্তানি কম হয়েছে। এ ছাড়া নির্বাচন সামনে রেখে অনিশ্চয়তায় ব্র্যান্ড-ক্রেতারা রপ্তানি আদেশ কম দিয়েছিল। সেটাও একটা বড় কারণ ছিল। আর মার্কিন পাল্টা শুল্ক এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় অস্থিরতার কারণে গত ৮ মাস ধরে রপ্তানি তো কমছেই।
বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, আগামী মাসেও রপ্তানির একই চিত্র দেখতে হতে পারে। নতুন করে মাথাব্যথার কারণ হিসেবে সামনে এসেছে ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ।
এতে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে যে উত্তেজনা শুরু হলো কবে নাগাদ সেটার সুরাহা হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় আমদানি-রপ্তানি ব্যয় এবং সময় দুটোই বাড়ছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে। এসব কারণে রপ্তানি খাতের জন্য শিগগির কোনো সুখবর দেখা যাচ্ছে না।
ইপিবির প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফেব্রুয়ারি মাসে পোশাক রপ্তানি কমেছে ১৩ দশমিক ২১ শতাংশ। রপ্তানি হয়েছে ২৮২ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক। গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে যা ছিল ৩২৪ কোটি ডলার। অর্থাৎ রপ্তানি আয় কমেছে ৪২ কোটি ডলার। তৈরি পোশাকের মধ্যে নিটপণ্যের অবস্থা বেশি খারাপ। নিট পোশাকের রপ্তানি কমেছে প্রায় সাড়ে ১৫ শতাংশ। রপ্তানি হয়েছে ১৪০ কোটি ডলারের নিটপণ্য। তুলনায় কিছুটা কম খারাপ পরিস্থিতি ওভেন অর্থাৎ শার্ট-প্যান্ট জাতীয় পোশাকের। এ জাতীয় পোশাকের রপ্তানি কমেছে ১১ শতাংশের কিছু কম। ১৪২ কোটি ডলারের ওভেন পোশাক রপ্তানি হয়েছে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে পোশাক রপ্তানি থেকে আয় এসেছে দুই হাজার ৫৮০ কোটি ডলার। এটি গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ কম। পোশাকের সমজাতীয় পণ্য হোম টেক্সটাইলের রপ্তানি কমছে ১ শতাংশের মতো। রপ্তানি হয়েছে আট কোটি ৩৫ লাখ ডলারের। তবে আগের মাসগুলোতে ভালো রপ্তানি আয়ের সুবাদে গত আট মাসের গড় রপ্তানি আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৩ শতাংশের মতো বেশি। নিট, ওভেন ও অন্যান্য সমজাতীয় পণ্য মিলে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় মোট রপ্তানি আয়ের ৮৭ শতাংশ আসে।
তৈরি পোশাকের বাইরে অন্য পণ্যের মধ্যে কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ। রপ্তানি নেমে এসেছে ছয় কোটি ডলারে। তবে কৃষি খাতের পণ্য চায়ের রপ্তানি বেড়েছে ২৬ শতাংশ। শুকনো খাবার রপ্তানি বেড়েছে ১৫ শতাংশ। বিভিন্ন ধরনের ফলমূল রপ্তানি বেড়েছে ১৩ শতাংশের মতো। যদিও সবজি রপ্তানি কমে গেছে ৩৮ শতাংশের মতো।
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি কমছে সাড়ে ৫ শতাংশের কিছু বেশি। সবচেয়ে বেশি রপ্তানি কমেছে চামড়ার জুতায়, ২১ শতাংশ। তবে চামড়া ও চামড়াপণ্যের রপ্তানি আগের গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের চেয়ে বিভিন্ন হারে বেড়েছে।
বড় পণ্যের মধ্যে পাটের রপ্তানি কমেছে ১১ শতাংশের বেশি। সবচেয়ে বেশি কমেছে কাঁচাপাট রপ্তানি। পণ্যটির রপ্তানি ৪০ শতাংশ কমেছে। পাটের বস্তার রপ্তানি কমেছে ৩১ শতাংশ। এই খাতের একমাত্র পাটের সুতার রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ৩ শতাংশ। সব মিলিয়ে পাট ও পাটপণ্য রপ্তানি থেকে আয় এসেছে ছয় কোটি ডলারের মতো। জীবন্ত ও হিমায়িত মাছের রপ্তানি কমেছে ৮ শতাংশের মতো। এ খাতের হিমায়িত চিংড়ি, কাঁকড়া সব পণ্যের রপ্তানি কমেছে। মোট রপ্তানি আয় এসেছে তিন কোটি ডলারেরর কিছু বেশি।
রপ্তানি খাতের উল্লেখযোগ্য পণ্যের মধ্যে ওষুধ ব্যতিক্রম। রপ্তানি বেড়েছে ২০ শতাংশ। রপ্তানি হয়েছে দুই কোটি ডলারের বিভিন্ন ওষুধ। এ ছাড়া প্লাস্টিক ও প্রকৌশল পণ্যের রপ্তানিও বেড়েছে ফেব্রুয়ারি মাসে।