একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সরকার

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য হলেও, ভোটের সময় নিয়ে এখনো একমত হতে পারেনি কেউ। কেউ জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে আয়োজনের পক্ষে, আবার কেউ জাতীয় নির্বাচনের আগেই গণভোট চান। এমন পরিস্থিতিতে সময়, ব্যয় ও প্রস্তুতির বিষয় বিবেচনা করে একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার।

সরকারের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী শুক্রবার জুলাই সনদ স্বাক্ষরের পর এই বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করা হবে।

ঐকমত্য কমিশনের সর্বশেষ বৈঠকেও গণভোটের দিনক্ষণ নিয়ে ঐক্যমত্য হয়নি। বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি দল জাতীয় নির্বাচনের দিনই গণভোট আয়োজনের পক্ষে রয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নির্বাচন-পূর্ব গণভোটের দাবিতে অনড় অবস্থান নিয়েছে।

শনিবার দুপুরে জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদের সঙ্গে কমিশনের বৈঠকে দলটির নেতারা আগের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। বিকেলে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও যুগ্ম আহ্বায়ক জাবেদ রাজিনও একই দাবি জানান।

জাবেদ রাজিন বলেন, জাতীয় নির্বাচনের দিন গণভোট হলে জুলাই সনদের গুরুত্ব কমে যাবে। জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে নির্বাচনের আগেই গণভোট হওয়া উচিত।

দলগুলোর বিভক্তির মধ্যেই শনিবার রাতে প্রধান উপদেষ্টা ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সভাপতি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে কমিশনের সদস্যদের বৈঠকে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। সেখানে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে আয়োজনের বিষয়ে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এক সরকারি সূত্র জানিয়েছে, জুলাই সনদ নিয়ে রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে উঠেছে। তাই শুক্রবার জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠিত হবে। এর পরই গণভোটের দিনক্ষণ বিষয়ে সরকারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসবে।

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) একটি সূত্র বলছে, একই দিনে দুটি ভোট আয়োজনের বিষয়ে সরকারকে অনানুষ্ঠানিকভাবে সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেন, গণভোটের সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রীয় বিষয়। সরকার চাইলে আমরা আয়োজন করতে পারব। তবে একসঙ্গে করলে বড় ব্যয় সাশ্রয় হবে। ফেব্রুয়ারিতে দুই নির্বাচন একসঙ্গে করা সম্ভব।

ইসি ইতিমধ্যে ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। কমিশনের হিসাবে এ নির্বাচনে ব্যয় হবে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। ৪০ হাজারের বেশি ভোটকেন্দ্র, আড়াই লক্ষাধিক ভোটকক্ষ ও প্রায় ১০ লাখ কর্মী নিয়োজিত থাকবে। একই দিনে গণভোট হলে কেবল কিছু ব্যালট পেপার ও ভোটকক্ষ বাড়াতে হবে বলে জানিয়েছে কমিশন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন সময় ও অর্থ সাশ্রয়ের সুযোগ সৃষ্টি করবে, তবে এতে প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপও বাড়বে।

ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকায় সরকারের ওপর সিদ্ধান্তের ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। সরকার প্রস্তুতি ও আর্থিক দিক বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

কমিশনের আরেক সদস্য ড. আবদুল আলীম বলেন, পৃথিবীর অনেক দেশেই সাধারণ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট হয়। বাংলাদেশের ভোটারদেরও একাধিক ব্যালটে ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা আছে, তাই এটি খুব কঠিন হবে না।

বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে গণভোটের কোনো বিধান ছিল না। ১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে গণভোটের ব্যবস্থা যুক্ত করেন। পরে আওয়ামী লীগ সরকার ২০১১ সালে এ বিধান বাতিল করে। তবে পঞ্চদশ সংশোধনী মামলার পর আদালতের রায়ে গণভোটের বিধান পুনরায় ফিরে আসে।

এ পর্যন্ত দেশে তিনটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। জুলাই সনদ–ভিত্তিক আসন্ন গণভোটটি হবে দেশের চতুর্থ গণভোট।

All Categories