ঈদে বেতন পরিশোধে ১৪ হাজার কোটি টাকা চায় পোশাক খাত

নানামুখী সমস্যায় রয়েছে দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান পণ্য তৈরি পোশাক খাত। রপ্তানি আয় কমছে। নতুন রপ্তানি আদেশও যথেষ্ট পরিমাণে মিলছে না। রপ্তানি পণ্যের দরও আগের চেয়ে কমে গেছে। টিকতে না পেরে ৪০০ কারখানা ইতোমধ্যে ছিটকে পড়েছে। আগামী ঈদে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধ করতে না পারার ঝুঁকিতে আছে অনেক কারখানা। শিল্পের এরকম একগুচ্ছ সমস্যার কথা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের কাছে তুলে ধরেছেন তৈরি পোশাক উৎপদান ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএ। 

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংক কার্যালয়ে গভর্নরের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এসব সমস্যা তুলে ধরার পাশাপাশি আগামী ঈদে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধে দুই মাসের মজুরি সমপরিমাণ অর্থ সহজ শর্তের ঋণ হিসেবে চাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া রপ্তানি খাতের জন্য প্রণোদনার বকেয়া খুব দ্রুত ছাড় করারও অনুরোধ জানিয়েছেন বিজিএমইএর নেতারা। 
জানা গেছে, ছাড়ের অপেক্ষায় থাকা প্রণোদনার অর্থের পরিমাণ পাঁচ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। পোশাক খাতে প্রতি মাসে মজুরির প্রয়োজন হয় গড়ে সাত হাজার কোটি টাকা। দুই মাসে প্রয়োজন হবে ১৪ হাজার কোটি টাকা। প্রণোদার অর্থ ছাড় ও ঋণ মিলিয়ে সরকারের কাছে চাওয়া অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। 

বৈঠকে বিজিএমইএর পক্ষে নেতৃত্ব দেন সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ইনামুল হক খান বাবলু। উপস্থিত ছিলেন সহসভাপতি শিহাব উদ্দোজা চৌধুরীসহ অন্য নেতারা। জানতে চাইলে ইনামুল হক খান সমকালকে বলেন, গভর্নরের কাছে শিল্পের বিভিন্ন সংকট তুলে ধরেছেন তারা। সংকট কাটাতে আপাতত প্রণোদনার বকেয়া অর্থছাড় এবং ঈদে বেতন-বোনাস দেওয়ার জন্য দুই মাসের বেতন সমপরিমাণ অর্থ সহজ শর্তের ঋণ চেয়েছেন তারা। এ ছাড়া ছোট কারখানার জন্য প্রণোদনা খাতে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার অনুরোধ করা হয়েছে, যাতে এরকম মানের কারখানা এই তহবিল থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঋণ পেতে পারে। কারণ অতীতে দেখা গেছে, এরকম তহবিল থেকে ছোট কারখানা খুব একটা সহায়তা পায়নি। 
বিজিএমইএ ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বলেন, গভর্নর তাদের দাবিগুলোর বিষয়ে খুব ইতিবাচক। প্রণোদনার অর্থ খুব শিগগিরই ছাড় করা হতে পারে। সহজ শর্তের ঋণও উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় সময়েই পাওয়া যাবে বলে তারা আশ্বস্ত হয়েছেন। 

বৈঠকে বিজিএমইএ নেতারা বলেন, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ– এই দুই মাসে প্রায় ২৫ দিন সরকারি ছুটি ও নির্বাচনী কার্যক্রমে কারখানা বন্ধ ছিল। অর্থাৎ মাত্র ৩৫ দিন কাজ করে ৬০ দিনের বেতন পরিশোধ অনেক কারখানার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। কারণ মাসের মাঝামাঝি সময়ে ঈদের তারিখ পড়ায় এবার ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন, ঈদ বোনাস এবং মার্চ মাসের অন্তত অর্ধেক বেতন আগাম দিতে হবে। এতে মার্চ মাসেই প্রায় দ্বিগুণ বেতন পরিশোধ করতে হবে। রপ্তানি পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় অর্থ সংকটে একসঙ্গে এত পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে না পারার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এই ঝুঁকি এড়াতেই সরকারের দ্বারস্থ হয়েছেন তারা। সংকট মোকাবিলায় পোশাক কারখানার উৎপাদন সচল রাখা এবং আসন্ন ঈদে মজুরি ও বোনাস পরিশোধে দুই মাসের সমপরিমাণ অর্থ ঋণ হিসেবে দেওয়া এবং তিন মাসের রেয়াতকালসহ ১২ মাসে পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার জন্য প্রচলিত ঋণসীমার বাইরে বিশেষ বিবেচনায় ঋণ সুবিধা চেয়েছেন তারা। 

শিল্পের সংকট বিষয়ে বিজিএমইএ নেতারা বলেন, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি মাস পর্যন্ত সময়ে আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে রপ্তানি কম হয়েছে ২ দশমিক ৪৩ শতাংশ। পোশাকের ইউনিট মূল্য কমেছে গড়ে ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ। উপরন্তু রপ্তানি আদেশও কমছে। শুধু নভেম্বরে রপ্তানি আদেশ কমেছে ৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ। ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন (ইউডি) গত ছয় মাসে আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে কমেছে ৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ। ব্যাক টু ব্যাক ঋণপত্র (এলসি) খোলার হার চলতি অর্থবছরের নভেম্বর পর্যন্ত কমেছে প্রায় ১৩ শতাংশ। এলসির অর্থে কাঁচামাল আমদানি এবং শ্রমিকদের মজুরির ২০ শতাংশ পরিশোধ করে থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেরিতে শিপমেন্ট ও রপ্তানি আদেশ পিছিয়ে দেওয়া। এরকম পরিস্থিতিতে টিকতে না পেরে ইতোমধ্যে ৪০০ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। 

প্রণোদনা বিতরণের বিষয়ে বিজিএমইএ নেতারা বলেন, বর্তমান ‘ফার্স্ট ইন, ফার্স্ট আউট’পদ্ধতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এসএমই কারখানাগুলোর জন্য আলাদা বিশেষ ব্যবস্থা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পৃথক তহবিল গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রথমে এসএমই খাতকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সহায়তা দেওয়া উচিত। এরপর অবশিষ্ট অর্থ বড় কারখানাগুলোর মধ্যে বিতরণ করা যেতে পারে।
জানা গেছে, বৈঠকে গভর্নর প্রণোদনার অর্থ দ্রুত ছাড়ের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। মজুরি পরিশোধে বিশেষ ঋণ পেতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে অবগত করার পরামর্শও দিয়েছেন তিনি। সূত্র জানায়, এ বিষয়ে আগেই অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে বিজিএমইএ। এ নিয়ে সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ও অর্থ সচিবের সঙ্গে বৈঠক করেছেন সংগঠনের নেতারা। নীতিগত সমন্বয় এবং প্রক্রিয়াগত অগ্রগতির জন্য গভর্নরের সঙ্গেও বৈঠক হয়েছে।

All Categories