দিশেহারা বিনিয়োগকারীরা: বাজার নিয়ন্ত্রণে অদক্ষ ও বিতর্কিত নেতৃত্ব
টানা দরপতনে দিশেহারা দেশের শেয়ারবাজার। দিনের পর দিন শেয়ারমূল্য কমতে থাকায় সর্বস্ব হারাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করেও মিলছে না কোনো সুরাহা। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠলেও, অবস্থার উন্নতির কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
এক সময়ের হাজার কোটি টাকার দৈনিক লেনদেন এখন নেমে এসেছে তিনশ কোটির ঘরে। অধিকাংশ বিনিয়োগকারী জীবনের সঞ্চয় নিয়ে শেয়ারবাজারে এসেছিলেন একটু ভালো ভবিষ্যতের আশায়। নতুন শার্ট না কিনে, পরিবারের ছোট ছোট আনন্দ বিসর্জন দিয়ে বিনিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু দিনের শেষে স্বপ্নের বদলে হাতে এসেছে শুধুই হতাশা।
বাজার বিশ্লেষকদের ভাষায়, বছরের পর বছর ধরে বিনিয়োগকারীদের 'গিনিপিগ' বানিয়ে চলছে নানান পরীক্ষা-নীরিক্ষা। অথচ লাভবান হচ্ছেন কেবল হর্তাকর্তারা।
গত ৫ আগস্টের পর বাজারে নতুন বন্দোবস্তের গন্ধে চাঙ্গাভাব ফিরেছিল। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বইছিল উৎসবের আমেজ। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়। বিশ্লেষকরা বলছেন, শেয়ারবাজার পরিচালনায় বসানো হয়েছে এমন ব্যক্তিদের, যারা বাজার পরিচালনার দক্ষতা বা অভিজ্ঞতা রাখেন না। ফলে দুরবস্থার সমাধান তো দূরের কথা, সমস্যা আরও বেড়েছে।
বিনিয়োগকারীদের সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদকে ঘিরে।
অভিযোগ রয়েছে, শেয়ারবাজার বিষয়ে পূর্বে তার কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। বরং একটি ব্যাংকের শীর্ষ পদে থেকে ঋণ কেলেঙ্কারিতে জড়ানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এসব অভিযোগের তদন্ত করছে বলেও জানা গেছে।
বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলছেন, “এমন বিতর্কিত ব্যক্তিকে দেশের স্পর্শকাতর একটি খাতে কেন বসানো হলো? বিনিয়োগকারীরা তার পদত্যাগের দাবি জানালেও এখন পর্যন্ত কোনো পরিবর্তন হয়নি। সরকারও তার ওপর আস্থা রাখছে।
গত সপ্তাহে বাজার আবারও বড় পতনের মধ্যে দিয়ে গেছে। প্রধান সূচক নেমে এসেছে পাঁচ হাজারের নিচে, যা করোনা মহামারির সময়ের পরিস্থিতির সাথে তুলনীয়। অথচ বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা তুলনামূলক স্থিতিশীল।
বিশ্লেষণ বলছে, টানা ৯ কার্যদিবসে ৩৬০টি কোম্পানি ও ৩৭টি মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ৩৪৯টির দর কমেছে। কিছু শেয়ারের দরপতন ১০ থেকে ৩৯ শতাংশ পর্যন্ত।
এ অবস্থার জন্য বাজার সংশ্লিষ্টদের দক্ষতার অভাব এবং রাজনৈতিক প্রভাবকে দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা।
"কোটা না মেধা?" — প্রশ্ন বিনিয়োগকারীদের
বিশিষ্ট সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, "পুঁজিবাজারের পরিস্থিতি চরম সংকটে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও আইসিবির চেয়ারম্যানের ব্যর্থতার কারণেই এই দুর্দশা। তাদের সরিয়ে দক্ষ ব্যক্তিদের আনতে সমস্যা কোথায়?"
সূত্র বলছে, বিএসইসি চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদের নাকি সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে, যে কারণে তাকে সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। বিনিয়োগকারীরা প্রশ্ন তুলছেন, ‘মেধার ভিত্তিতে না কি আত্মীয়তার ভিত্তিতে চলছে এই নিয়োগ?’
দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ, বৈদেশিক লেনদেন সবখানেই ইতিবাচক ধারা ফিরেছে। কিন্তু শেয়ারবাজার যেন সেই উন্নয়নের ধারায় উপেক্ষিতই থেকে গেছে। বাজার বিশ্লেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, এভাবে চলতে থাকলে পুঁজিবাজার আরও বড় সংকটে পড়বে।
দিন শেষে প্রশ্ন একটাই—বিনিয়োগকারীদের স্বপ্ন কি এভাবেই ভেঙে যাবে? নাকি নীতিনির্ধারকরা এখনই জেগে উঠবেন?