ঢাকাবাসী গত ৯ বছরে মাত্র ৩১ দিন নির্মল বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে পেরেছেন
রাজধানী ঢাকা দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের শীর্ষ দূষিত শহরগুলোর তালিকায় রয়েছে। বায়ুদূষণের এমন চিত্রে শ্বাস নেওয়া দুঃসহ হয়ে উঠেছে নগরবাসীর জন্য। বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) বলছে, গত ৯ বছরে (২০১৬-২০২৪) ঢাকার মানুষ মাত্র ৩১ দিন নির্মল বা ভালো বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে পেরেছে। অর্থাৎ, ৩ হাজার ১১৪ দিনের মধ্যে ভালো বায়ুর দেখা মিলেছে মাত্র ১ শতাংশ সময়।
মার্কিন দূতাবাসের সরবরাহকৃত ২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের বায়ুমান সূচক (একিউআই) বিশ্লেষণ করে এই তথ্য জানিয়েছে ক্যাপস। মঙ্গলবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) ‘বিশ্ব ধরিত্রী দিবস ২০২৫: বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণে করণীয়’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। সম্মেলনের আয়োজন করে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও ক্যাপস।
গবেষণার তথ্য তুলে ধরে ক্যাপসের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার জানান, ঢাকায় গত ৯ বছরে মানুষ মাত্র ৩১ দিন (১%) নির্মল বা ভালো বায়ুতে নিঃশ্বাস নিতে পেরেছে। তবে এক্ষেত্রে ৬২৪ দিন (২০%) মাঝারি বায়ু, ৮৭৮ দিন (২৮%) সংবেদনশীল বায়ু, ৮৫৩ দিন (২৭%) অস্বাস্থ্যকর, ৬৩৫ দিন (২১%) খুব অস্বাস্থ্যকর এবং ৯৩ দিন (৩%) দুর্যোগপূর্ণ বায়ু গ্রহণ করেন। ২০২৪ সালের সবচেয়ে ভাল ও সবচেয়ে খারাপ বায়ুমানের দিনসংখ্যা হলো যথাক্রমে ২ ও ৩৫ দিন।
বিশ্ব ব্যাংকের ২০২২ সালের প্রতিবেদন অনুসারে, শুধু ২০২১ সালেই বাংলাদেশে বায়ুদূষণের কারণে অন্তত ২ লাখ ৩৬ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার (সিআরইএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বায়ুদূষণে ৫ হাজার ২৫৮ শিশুসহ প্রায় ১ লাখ ২ হাজার মানুষের অকালমৃত্যু হচ্ছে।
গত ৯ বছরে ২০২১ ও ২০২৩ সালে ছিল সবচেয়ে বেশি অস্বাস্থ্যকর বায়ুমানের দিন। ২০২১ সালে ৮৬ দিন এবং ২০২৩ সালে ১৩৩ দিন অস্বাস্থ্যকর ছিল। এছাড়া ২০২৩ সালে ১৪ দিন ছিল অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর বা দুর্যোগপূর্ণ, যা অন্য বছরের তুলনায় সর্বোচ্চ।
২০২৪ সালের জানুয়ারি মাস ছিল সবচেয়ে দূষিত। ওই মাসে একিউআইয়ের গড় মান ছিল ৩০০, বিপরীতে সবচেয়ে ভালো অবস্থান ছিল ২০২১ সালের জুলাইয়ে, তখন গড় মান ছিল ৯৭।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা আইকিউএয়ারের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০২১ ও ২০২৩ সালে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত দেশের তালিকায় শীর্ষে ছিল। ২০২৪ সালে অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। একই বছর বিশ্ব শহরভিত্তিক দূষণের তালিকায় ঢাকা ছিল তৃতীয়।
জেলাভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে দূষিত জেলা গাজীপুর। এখানকার বাতাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্ধারিত মানের তুলনায় ১৮ গুণ বেশি অতি সূক্ষ্ম বস্তুকণা পাওয়া গেছে। সবচেয়ে কম দূষিত জেলা সিলেট হলেও এখানেও দূষণের মাত্রা ডব্লিউএইচওর মানের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেশি।
বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে বাপা ও ক্যাপস একাধিক সুপারিশ তুলে ধরেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে মেয়াদোত্তীর্ণ ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন নিষিদ্ধ করা।বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড গাড়ির ব্যবহার বৃদ্ধি।ব্লক ইটের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশবান্ধব ইট উৎপাদন।বর্জ্য পোড়ানো বন্ধ করে তা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন।জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা।নির্মল বায়ু আইন প্রণয়ন।জ্বালানি নীতিতে পরিবেশবান্ধব সংশোধন।শিল্প ও বিদ্যুৎখাতে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ এবং তার কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে দেশ।