দেশে দৈনিক গড় হত্যার শিকার ১০ জন, জনমনে শঙ্কা

রংপুরে একটি বাসায় শিক্ষক পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে বিচ্ছিন্ন কোনো একটি হত্যাকাণ্ড নয়, গত কয়েক মাস ধরে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক হত্যার ঘটনা ঘটছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি বাড়ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই—এই সাত মাসে সারা দেশে খুনের ঘটনায় ২ হাজার ৭৬টি মামলা হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ৩০০টি খুনের মামলা হয়েছে। শুধু মে থেকে জুলাই—এই তিন মাসেই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হয়েছে ৯৩৪টি। সে হিসাবে এই সময়ে প্রতিদিন গড়ে ১০টির বেশি খুনের মামলা হয়েছে।

পুলিশ বলছে, চুরি, ডাকাতি ও দস্যুতার মতো অপরাধ কিছুটা কমলেও হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা আশানুরূপভাবে কমানো সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতি মাসে কমবেশি ৩০০টি খুনের ঘটনা ঘটছে। গড়ে প্রতিদিন ১০টি করে খুন যেন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় বিরোধ ও অস্থিরতার অনেক ঘটনা আগে থেকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। তবে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করে যাচ্ছে।

সাত মাসে খুনের মামলা ২ হাজার ৭৬টি

পুলিশ সদর দপ্তর প্রতি মাসে খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, চুরি-ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় হওয়া মামলার পরিসংখ্যান প্রকাশ করে।

সেই হিসাবে জানুয়ারি মাসে খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে ২৮৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০, মার্চে ৩১৭, এপ্রিলে ২৮৮, মে মাসে ৩১০, জুনে ৩২৬ এবং জুলাইয়ে ২৯৮টি। সব মিলিয়ে সাত মাসে মামলা হয়েছে ২ হাজার ৭৬টি।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে ১ হাজার ৭৮৯টি। এর আগের ছয় মাসে এই সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৭৮০। অর্থাৎ ছয় মাসের তুলনায় খুনের মামলা বেড়েছে ৯টি।

শুধু খুন নয়, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাও বেড়েছে। গত ছয় মাসে এ ধরনের ঘটনায় মামলা হয়েছে ১১ হাজার ১৬৫টি। এর আগের ছয় মাসে মামলা হয়েছিল ১০ হাজার ৯০টি। অর্থাৎ মামলা বেড়েছে ১ হাজার ৭৫টি।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, দেশে বৈধ ও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের বিস্তার, রাজনৈতিক সংঘাত, ক্ষমতার আধিপত্য, মাদক এবং পারিবারিক বিরোধ—এসব কারণে হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতা বাড়ছে।

অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, অনেকের হাতে এখন অস্ত্র চলে গেছে। অবৈধ অস্ত্রের চোরাচালানও বাড়ছে। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, পারিবারিক বিরোধ ও ক্ষমতার আধিপত্যের কারণে খুন ও সহিংসতার ঘটনা বাড়ছে।

রাজনৈতিক কোন্দলেও বাড়ছে সহিংসতা

গত রোববার রাতে কিশোরগঞ্জের ভৈরব পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগ নেতা আল আমিনকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া গত ফেব্রুয়ারিতে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি, জামায়াত, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এনসিপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘাত-সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ৪০০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন ২ হাজার ৯৭৪ জন এবং নিহত হয়েছেন অন্তত ৭৭ জন।

এর মধ্যে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘাতে নিহত হয়েছেন চারজন, জামায়াত ও বিএনপির সংঘাতে নয়জন এবং বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে নিহত হয়েছেন ১৬ জন।

আসকের হিসাবে, রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ৭৭ জনের মধ্যে অন্তত ৪০ জন দুর্বৃত্তদের হামলা ও গুলিতে নিহত হয়েছেন।

মানবাধিকারকর্মী ও বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন এলিনা খান বলেন, নির্বাচিত সরকারের সময়ে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতা বাড়ছে। পদ-পদবি নিয়ে সংঘাত হচ্ছে। এর দায় সরকারকেই নিতে হবে।

পুলিশ অবশ্য বলছে, রাজনৈতিক কোন্দল নতুন কিছু নয়। এসব সংঘাত নিয়ন্ত্রণে পুলিশ নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে।

অতিরিক্ত আইজি খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা আগেও ঘটেছে, এখনো ঘটছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে পুলিশের ওপর কোনো ধরনের চাপ নেই এবং পুলিশ নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারছে।

কেন নিয়ন্ত্রণে আসছে না অপরাধ

গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বড় ধরনের অবনতি হয়েছিল। বিভিন্ন থানায় হামলা ও অস্ত্র লুটের ঘটনাও ঘটে। পরে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করে।

তবে পুলিশ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পরিসংখ্যান বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের তুলনায় বর্তমান নির্বাচিত সরকারের প্রথম ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে বড় ধরনের উন্নতি হয়নি।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখনো পুরোপুরি আগের সক্ষমতায় ফিরতে পারেনি। এই সুযোগে খুন, সহিংসতা ও অন্যান্য অপরাধ বাড়ছে।

অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, খুন ও সহিংসতার মতো অপরাধ যেভাবে বাড়ছে, সে তুলনায় দমনমূলক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষায়িত অভিযান চালানো দরকার। ২০২৪ সালের আগস্টের পর পুলিশের অনেক সদস্য মনোবল হারিয়েছেন এবং অনেকে এখনো ভীতি নিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন।

মব সহিংসতাও বড় উদ্বেগ

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মব সহিংসতা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছিল। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও এ ধরনের ঘটনা বন্ধ না হওয়ায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে মব সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ১৩৪ জন। এর মধ্যে ঢাকায় নিহত হয়েছেন ৫০ জন এবং চট্টগ্রামে ৩১ জন।

এলিনা খান বলেন, এটি একটি নির্বাচিত সরকার। মানুষ নিরাপত্তা চায়। যেকোনো মূল্যে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে মব সহিংসতা ও অন্যান্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।

তবে পুলিশের অতিরিক্ত আইজি খোন্দকার রফিকুল ইসলাম দাবি করেন, আগের তুলনায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। চুরি, ডাকাতি ও দস্যুতার মতো অপরাধ কমেছে। তবে খুনের ঘটনা এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কমানো সম্ভব হয়নি।

একদিকে ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড, অন্যদিকে রাজনৈতিক ও মব সহিংসতার ঘটনায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শুধু অপরাধী গ্রেপ্তার নয়, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, রাজনৈতিক সংঘাত বন্ধ, স্থানীয় বিরোধ দ্রুত মীমাংসা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে জোর দিতে হবে।

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন

All Categories